সততা ও মেধার ক্ষেত্র বিস্তৃতির জন্য দলগত আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন
November 22, 2023
ভোট দিতে যাওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে এক নাগরিকের প্রত্যাশা
December 20, 2023

বিদেশী নাগরিকত্বে সংসদের ট্রেডিং হাউজে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি

বণিক বার্তা|

জাতীয় নির্বাচন |

ডিসেম্বর ১৩, ২০২৩|

ড. সাজ্জাদ জহির |

আগের বেশকিছু লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে দ্বৈত নাগরিক নামে একটি আইনি সত্তার অনুমোদন ১৯৫১ সালের নাগরিকত্ব আইনের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যদিও বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বিদেশী নাগরিকরা অন্য পাঁচজন বিদেশীদের তুলনায় সীমিত পরিসরে অধিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার দাবি রাখেন, তাদের বাংলাদেশী নাগরিকদের (যাদের আনুগত্য শুধু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি রয়েছে) সমপর্যায়ে দেখা সমীচীন নয়। বিশেষ করে, দেশের সংবিধানে বর্ণিত যোগ্যতার মানদণ্ড এবং দেশের আইন ও বিধিগুলোর বর্তমান ব্যাখ্যার পরিপ্রেক্ষিতে এটি বোঝা যায় বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এই বিদেশী নাগরিকরা (এফসিবিও-ফরেন সিটিজেনস অব বাংলাদেশ অরিজিন) দেশের সংসদে সদস্যপদপ্রার্থী হওয়ার জন্য নাগরিকত্ব-সম্পর্কিত পূর্বশর্ত পূরণ করেন না। এমনকি তারা কোনো কোনো সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হতে পারেন না বলে জেনেছি। প্রধানমন্ত্রী সংবিধানকে সমুন্নত রাখার এবং এর মৌলিক নীতিমালার কোনো লঙ্ঘন না হওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।

ওপরে বর্ণিত প্রেক্ষাপটে, এটা কাঙ্ক্ষিত ছিল রাজনৈতিক দলগুলো, তাদের মনোনীত ব্যক্তিদের প্রার্থী হওয়ার আবেদন নির্বাচন কমিশনে (নিক) জমা দেয়ার আগে, যাচাই-বাছাই করে দেখবেন। সেটা করলে নিকের ওপর চাপ কম পড়ত। তবে অনস্বীকার্য, চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব নিক-এর। স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে এককভাবে তারাই এ কাজটি করবে এবং দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্বও নিক-এর। এ কাজটি পোক্ত হয় যদি নিক প্রার্থী পর্যায়ে এবং মনোনয়নকারী রাজনৈতিক দলগুলো (কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব) কর্তৃক হলফনামা দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়, যেখানে ‘বাইরের দেশের নাগরিক নই’ মর্মে স্বীকৃতি থাকবে। রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে অঙ্গীকার থাকবে, মনোনীত কোনো প্রার্থীই বাইরের দেশের নাগরিক নন। এছাড়া বাংলাদেশের বিদেশী মিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবি), দেশের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে এবং নেট থেকে সংগৃহীত তথ্য, একজন প্রার্থীর ‘বিদেশী নাগরিকত্বের স্থিতি’ মূল্যায়নে সহায়ক হবে।

সম্প্রতি প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, বিদেশী নাগরিকত্ব (সাধারণত দ্বৈত নাগরিকত্ব হিসাবে আখ্যায়িত) থাকার কারণে নির্বাচন কমিশন কারো কারো প্রার্থিতা প্রত্যাখ্যান করেছে। অবহেলিত এ বিষয়টি নিকের নজরে এসেছে এবং তারা এ-সংক্রান্ত কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে জেনে আশা জাগে। সেসব খবরে জানা যায়, বরিশাল-৪ আসনের আ. লীগ মনোনীত প্রার্থী (এবং আ.লীগ আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সচিব!) শাম্মী আহমেদ অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক হওয়ার কারণে নিক তার প্রার্থিতার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রার্থী আপিল করেছেন কিনা তা অজানা। জানা যায়, এ-সংক্রান্ত সব আপিলের সুরাহা কিছুটা বিলম্বে করা হবে। গণমাধ্যমে আসা আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো ফরিদপুর-৩ আসনে আ.লীগের প্রার্থী শামীম হকের প্রার্থিতা বাতিলে স্বতন্ত্র প্রার্থী এ কে আজাদ নিক-কে অনুরোধ করেছেন। জনাব হক বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের দ্বৈত নাগরিকত্বের অধিকারী বলে অভিযোগ করা সত্ত্বেও শামীম হকের প্রার্থিতা আবেদন নাকচ করা হয়নি। জনাব আজাদ আপিল করেছেন বলে জানা গেছে, যদিও সেই আবেদনের ফল জানা যায়নি।

নাগরিকত্ব যাচাই করার জন্য নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কোনো ব্যবস্থা না থাকায় হতাশ হতে হয়। শামীম হকের প্রার্থিতা বাতিলে জনাব আজাদের আপিলের ক্ষেত্রে অনুসরণ করা পদ্ধতিটি পড়লে মনে প্রশ্ন জাগে। কেন একজন প্রার্থী বিদেশী নাগরিকত্ব থাকার কারণে যোগ্য নয়, তা প্রমাণ করার দায়িত্ব অভিযোগকারীর ওপর বর্তাবে? জানা গেছে, আপিলটিতে জনাব হকের বিদেশী পাসপোর্টের ফটোকপি প্রমাণ হিসেবে দিতে হয়েছিল। যদি অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতা নিয়ে বিদ্যুতের অর্থ প্রদান, অনাদায়ী ঋণ-সংক্রান্ত ব্যাংক ছাড়পত্র, আয়কর প্রদান, ইত্যাদি পূর্বশর্ত নিশ্চিত নিক-এর পক্ষে করা সম্ভব হয়, সেক্ষেত্রে ভিনদেশের নাগরিকত্ব যাচাই কেন সম্ভব হবে না, তা বোধগম্য নয়। ন্যূনতম প্রতিজন প্রার্থীর একটি হলফনামা জমা দেয়া বাধ্যতামূলক করা উচিত, যেখানে উল্লেখ থাকবে তিনি অন্য কোনো দেশের নাগরিক নন এবং পরবর্তী যেকোনো সময়ে তা মিথ্যা প্রমাণিত হলে, তার প্রার্থিতা বা পদ খারিজ হবে। এ জাতীয় কঠোর ব্যবস্থা না থাকলে জাতীয় সংসদে অনাকাঙ্ক্ষিত এবং সাংবিধানিকভাবে অবৈধ ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ ঘটবে। সেই সম্ভাবনাকে খাটো করে দেখার উপায় নেই। নাগরিকত্বের ব্যাপারে ভুল তথ্য দিয়ে বা তথ্য গোপন করে আরো অনেক প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিকের অনুমোদন পেয়ে থাকতে পারে। সে সবের অনেক ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ না হতে পারে, যার ফলে সেসব প্রার্থীর নাগরিকত্ব, পরিচয় এবং অবৈধ অংশগ্রহণ জনসাধারণের দৃষ্টির অন্তরালে রয়ে যাবে। এটা জরুরি যে নির্বাচন কমিশন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং সংবিধান সমুন্নত রাখার জন্য বর্তমান যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনবে।

বিদেশে নাগরিকত্ব নেয়ার কারণে কোনো ব্যক্তিকে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে না দেয়ার জন্য সংবিধানে যথেষ্ট কার্যকারণ রয়েছে। ভেবে দেখুন, একটি সার্বভৌম দেশের (বাংলাদেশ) আইন প্রণয়নকারী সংস্থায় (জাতীয় সংসদ) এমন সব সদস্য রয়েছেন যারা অন্য দেশের নাগরিক এবং যাদের আইনানুগ বশ্যতা সেই দেশের সংবিধানের প্রতি! সে দেশের নাগরিকত্ব নেয়ার শপথে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগের কথা উল্লেখ করুক বা না করুক, কার্যত নতুন দেশে নাগরিকত্ব গ্রহণের ফলে সেই দেশের সরকারের (এবং রাষ্ট্রের) প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা হয়। সংবিধান লঙ্ঘন ছাড়াও এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিদের সংসদে অন্তর্ভুক্তির ফলে ভিন্ন একটি বিপদের সম্ভাবনা জাগে। দেশের আইন প্রণয়ন বা পরিমার্জনের কেন্দ্র না হয়ে সংসদ একটি ট্রেডিং হাউজে (বাণিজ্য কেন্দ্রে) পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা জাগে, যেখানে টেন্ডার ও সরকারি স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের দরকষাকষি ও বণ্টন নিকটত্বের কারণে সহজ হয়। তথ্য ঘাঁটলেই জানা যাবে, সব প্রধান ঔপনিবেশিক শাসকদের (তথাকথিত উন্নত পশ্চিম) দেশে এসব ‘দ্বৈত নাগরিক’গণ ছড়িয়ে আছেন এবং সেসব দেশের বিভিন্ন ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর চাহিদা মেটাতে সংসদে অনুপ্রবেশকারীরা তৎপর হওয়াটাই স্বাভাবিক। স্পষ্টতই এটি ওয়াশিংটন ডিসি (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র), লন্ডন (যুক্তরাজ্য), সিডনি (অস্ট্রেলিয়া), ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোয় বিশেষ ভিসাধারী ব্যক্তির মধ্যে (যেমন মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ভারত) কাউন্টারপার্ট ‘ট্রেডিং হাউজ’গুলোর গুরুত্ব বৃদ্ধি করবে!

দেশের সম্পদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এবং রাষ্ট্র ‘ব্যর্থ’ হিসেবে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত একটি অনুন্নত দেশে এ ধরনের ব্যবসা চলতে পারে! সেই ক্রান্তিকাল সৃষ্ট হলে এফসিবিওরা গণহারে বিদায় নেবে, যা সংসদে শূন্যতা সৃষ্টি করে অরাজকতার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। একটি ভূখণ্ডের সব দিকে বেড়ার বেষ্টনী হয়তো ন্যায্যতা খুঁজে পায় এমনই একটি আশঙ্কায়! এসব শঙ্কা জাগার কারণে বিষয়টির প্রতি নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এবং আশা করছি যে তারা প্রমাণ করবেন নির্বাচন না হওয়ার চেয়ে একটি সুষ্ঠু ও সংবিধান মোতাবেক নির্বাচন হওয়া ভালো। প্রার্থিতা যাচাই-বাছাইয়ের বর্তমান পর্যায়ে সংসদে অনুপ্রবেশের প্রথম ধাপ হিসেবে অনাকাঙ্ক্ষিত (ও সাংবিধানিকভাবে অবৈধ) ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ বন্ধ করার জন্য সব সম্ভাব্য উপকরণ প্রয়োগ করার জন্য নিককে আন্তরিকভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে। যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে, নন-এফসিবিওর ঘোষণাসহ একটি হলফনামা হলো প্রথম আইনি পদক্ষেপ, যা আরোপ করা জরুরি। আরো কিছু সাদামাটা পদ্ধতি রয়েছে যা নিক পরবর্তী ধাপে বিবেচনা করতে পারে। ভিনদেশে নাগরিকত্ব নেয়া ব্যক্তির ওপর অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সেসব দেশের আয়কর আইনজীবীরা সরবরাহ করতে পারেন, কিন্তু তারা তাদের মক্কেলদের হয়তো হারাতে চাইবেন না। বিকল্প পন্থা হিসেবে প্রতিটি প্রার্থীকে পূর্ব নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশ (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, হল্যান্ড বা নেদারল্যান্ডস, ইত্যাদি) থেকে আগমন বা সেখানে গমনের শেষ তারিখ ঘোষণা করতে বলা যেতে পারে। একজন অনুমোদিত কর্মকর্তা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন যে ভ্রমণটি বিদেশী পাসপোর্ট ব্যবহার করে করা হয়েছিল কিনা। যদি বাংলাদেশী পাসপোর্ট ব্যবহার করে ভ্রমণ করা হয়, সেই পাসপোর্টে বিশেষ ভিসা (যেমন পিআর বা গ্রিন কার্ড) ছিল কিনা। এসব উপাত্ত বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট দপ্তরের তথ্যাভাণ্ডারে পাওয়ার কথা। এসবের বাইরে, প্রার্থীর বাংলাদেশের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় পরিপূরক তথ্য সংগ্রহ সম্ভব। এসব উদ্যোগ নৈর্ব্যক্তিকভাবে কার্যকর করা হলে প্রার্থীর ভিনদেশের নাগরিকত্ব যাচাই করতে সহায়ক হবে।

সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগে উপরোক্ত বিষয়ে কার্যকর যাচাই-বাছাই বাস্তবায়ন জরুরি। আমরা এমন ব্যক্তিতে ভরা নতুন সংসদ দেখতে চাই না যারা সহজেই রঙ পরিবর্তন করতে পারবে এবং রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়াকে বিপন্ন করবে।

ড. সাজ্জাদ জহির: অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের (ইআরজি) নির্বাহী পরিচালক

Source: https://bonikbarta.net/home/news_description/365601/%E0%A6%AF%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%A4-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A7%87-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%95-%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AD%E0%A6%B0%E0%A6%B6%E0%A7%80%E0%A6%B2%E0%A6%A4%E0%A6%BE-%E0%A6%93-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%9F

298