কালবেলা |
যত মত তত পথ |
১৩ মার্চ ২০২৬ |
ড. সাজ্জাদ জহির |
ব্যাংকগুলোকে ‘টাকা বানানোর মেশিন’ ভাবার মানসিকতা থেকে বের হতে হবে
ড. সাজ্জাদ জহির অর্থনীতিবিদ এবং গবেষক। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য (পরিচালক) এবং বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের (ইআরজি) নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতের সংকট, খেলাপি ঋণ, কাঠামোগত দুর্বলতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, নতুন গভর্নর নিয়োগ বিতর্ক, ব্যাংক একীভূতকরণ ও ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অবস্থাসহ অর্থনীতির নানা ইস্যু নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছে কালবেলা।
কালবেলা: ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর অবস্থা আমরা দেখছি। খেলাপি ঋণ কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই সংকটের পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায় কতটুকু বলে মনে করেন?
সাজ্জাদ জহির: ব্যাংকিং খাতের এই চরম অব্যবস্থাপনা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ইতিহাস ২০২৪-এর পূর্বেকার সরকারের আমল থেকেই চলে আসছে। আমার আগের কাজের সংশ্লিষ্টতা থেকে জেনেছি, এই খাতে ক্ষমতার এত চরম অপব্যবহার হয়েছে যে, অনেক সময় মানুষের জীবনও হুমকির মুখে পড়েছে। আমার মনে আছে, আব্দুর রউফ তালুকদার গভর্নর থাকাকালে আমি এবং মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন সাহেব তাঁর সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বসেছিলাম। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, আমি হাসতে হাসতে রউফ সাহেবকে বলেছিলাম, ‘আপনাদের সুরক্ষার জন্য র্যাবের মতো নিজস্ব একটি বাহিনী রাখা উচিত।’ কথাটি মজার শোনালেও বাস্তব অবস্থা এমনই ছিল—কেউ যদি বন্দুক ঠেকিয়ে বা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সই আদায় বাঁ নীতি-পরিবর্তন করে নিতে পারে, নিজেদের ও নীতি সুরক্ষার ব্যবস্থা ব্যাংকের থাকাটা জরুরি।
কালবেলা: তাহলে কি এই লুটপাটের দায় কেবল বাইরের প্রভাবশালীদের? ব্যাংকের ভেতরের কর্মকর্তাদের যোগসাজশ বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
সাজ্জাদ জহির: আমি তাদের পক্ষ নিচ্ছি না। এখানে অনেকেই বাধ্য হয়ে অন্যায় কাজ করেছেন, কেউ প্রতিরোধ করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, আবার অনেকেই এসবের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন। তবে এসব অনিয়ম কেবল দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ওপর ছেড়ে দেওয়াটা যৌক্তিক নয়। দুদক অপরাধী চিহ্নিত করবে, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরেও নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন ছিল। এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সুশাসন প্রতিষ্ঠার নিজ নিজ উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন।
কালবেলা: ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ৪০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। মাত্র ৫ হাজার ব্যক্তির কাছেই আটকে আছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ কী?
সাজ্জাদ জহির: এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমে পুরো খাতের একটি সঠিক মূল্যায়ন বা স্টক টেকিং প্রয়োজন ছিল। গত দেড় বছরেই যে সব খেলাপি ঋণ বেড়েছে, তা নয়। এগুলো আগেই ছিল, কিন্তু ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের মাধ্যমে তা কাগজে-কলমে অদৃশ্য রাখা হয়েছিল। ঋণ থেকে সঞ্চিতের স্থলে নগদ প্রাপ্তি প্রকাশ পাওয়ায় ব্যাংকগুলোর প্রকৃত লোকসান বেরিয়ে আসছে।
সংকট উত্তরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ছিল ঘাটতির পরিমাণটি অকপটে স্বীকার করা। কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ ১২ বা ১৫ শতাংশ দেখানো হলেও বাস্তবে এটি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ—এই বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যৎ উত্তরণের রোডম্যাপ তৈরি করা উচিত ছিল। কিন্তু অস্বস্তিকর সত্যকে ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। শুধু স্থানীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাই নয়, বৈশ্বিক তদারককারীরাও জেনেশুনে এই ভুল তথ্যে সায় দিয়েছে, যা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।
শুরু থেকেই সদ্য-বিদায়ী গভর্নর ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তিনি প্রকাশ্যে মন্তব্য না করে যদি অভ্যন্তরীণভাবে শক্ত পদক্ষেপ নিতেন এবং ভবিষ্যতে এসব অনিয়ম রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন, তবে পরিস্থিতি অধিক উন্নত করা সম্ভব হতো।
কালবেলা: এই বিপুল খেলাপি ঋণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট মোকাবিলার জন্য আপনার প্রস্তাবিত সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপটি কেমন হওয়া উচিত?
সাজ্জাদ জহির: এই পরিস্থিতি মোকাবিলার রোডম্যাপে দুটি মূল দিক থাকতে হবে। প্রথমত, দেউলিয়া আইন কার্যকর করা। ব্যাংক মার্জার বা একীভূতকরণই একমাত্র সমাধান নয়। আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যাংক মালিক হওয়ার এক ধরনের ভ্রান্ত ‘প্রেস্টিজ ইস্যু’ কাজ করে। তারা ব্যাংকগুলোকে নিজেদের ব্যক্তিগত অর্থ-ভান্ডার মনে করে। একদিকে কর্পোরেট সুশাসনের কথা বলব, অন্যদিকে সামন্ততান্ত্রিক কায়দায় ব্যাংক চালাব—এটি চলতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, কোনো ব্যাংক যদি টিকতে না পারে, তবে তার দায়ভার পুরোপুরি ওই ব্যাংকের কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তাবে। ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেলে সমস্ত সম্পদ বিক্রি করে সবার আগে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া উচিত—এটিই হওয়া উচিত প্রথম বাধ্যবাধকতা। আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার পর ব্যাংকটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে নাকি অন্য কেউ কিনে নেবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
‘এসেট রিকভারী ট্যাস্ক ফোর্স’ দ্বারা, অর্থাৎ, সম্পদ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে খেলাপি বা অনাদায়-সম্ভাব্য ঋণের বিপরীতে জামানত-সম্পদের যে তালিকা করা হয়েছে তা জনসমক্ষে আসা উচিত এবং আইনিভাবে সেসবের ক্রোক জরুরী – যার বিপরীতে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের কাছে ব্যাংকগুলোর দেনা মেটানোর প্রাথমিক উদ্যোগ আস্থা ফিরিয়ে আনায় সহায়ক হবে। তবে সামষ্টিক স্বার্থে সকলের উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে, রাতারাতি হিসেবের খাতা গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে আনা দুষ্কর। সেই ধৈর্য্যে আশান্বিত করতে সৎ উদ্দেশ্যের দৃশ্যমান প্রকাশ দরকার।
কালবেলা: ব্যাংকিং খাতের সংকটে সাধারণ আমানতকারীরাই ভোগান্তিতে পড়েন, কিন্তু ঋণখেলাপি বা মালিকদের কোনো সমস্যা হয় না। এই বৈষম্য কেন?
সাজ্জাদ জহির: এই বৈষম্য দূর করতে আমি একটি সাধারণ কিন্তু কড়া প্রস্তাব দিয়েছিলাম—যেসব ব্যাংক লোকসানে আছে বা যাদের খেলাপি ঋণ অনেক বেশি, অন্তত সেসব ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি বা বোনাস দেওয়া অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত। কারণ, ব্যাংকগুলো মূলত আমানতকারীদের টাকা নিয়েই ব্যবসা করে।
আমি যদি সৎভাবে ব্যবসা না করি এবং আমার ভুলের কারণে ব্যাংক যদি খালি হয়ে যায়, তবে আমি কীভাবে নিজের বেতন বৃদ্ধির দাবি করতে পারি? বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনভোগীর মধ্যে আয়ের পার্থক্যের একটি সীমা থাকা দরকার। মুনাফার মাত্রা এমনভাবে বেঁধে দেওয়া উচিত যাতে শীর্ষ কর্মকর্তারা বা মালিকরা সিস্টেম থেকে ইচ্ছেমতো টাকা বের করে নিতে না পারেন।
কালবেলা: সর্বশেষ গভর্নরকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?
সাজ্জাদ জহির: সাম্প্রতিক ঘটনাটি দেখে মনে হয়েছে, খুব অল্প সময়ের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে প্রজ্ঞাপন জারি করে একজনকে প্রত্যাহার করা হলো এবং আরেকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হলো। এই প্রক্রিয়াটি একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সিদ্ধান্তটি পূর্বপরিকল্পিত হলে বিদায়ী গভর্নরের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ থাকত এবং তাঁকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে বিদায় জানানো যেত।
বিদায়ী গভর্নর দেশের এক কঠিন সময়ে দায়িত্ব পালন করে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ২০২৪-পূর্ববর্তী গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর পালিয়ে গিয়েছিলেন—বর্তমান ক্ষেত্রে সেরকম হওয়ার কোনো কারণ বা প্রয়োজন ছিল না। বিষয়টি আরও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করলে ভালো হতো।
কালবেলা: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা সাধারণত অর্থনীতিবিদ বা বিশেষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি হয়ে থাকেন। একজন ব্যবসায়ীকে এই পদে নিয়োগের সিদ্ধান্তটি কতটা যৌক্তিক?
সাজ্জাদ জহির: জ্ঞানার্জনের প্রক্রিয়া যেহেতু নানাবিধ, তাই কে কোথা থেকে কী পড়েছেন কেবল তা দিয়েই একজন ব্যক্তির জ্ঞানের পরিধি পুরোপুরি বিচার করা যায় না। ড, আহসান মনসুরের আইএমএফ, ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং গবেষণা কাজের অভিজ্ঞতায় তাঁর জ্ঞানের যে পরিধি প্রতিফলিত হয়েছে, সম্ভবত তার ভিত্তিতেই নিয়োগকর্তারা তাঁকে এই পদে বেছে নিয়েছিলেন। লক্ষণীয় যে তিনি ব্যবসার সাথে যুক্ত ছিলেন। ভিন্ন যুক্তিতে বর্তমান সরকার সেসব অভিজ্ঞতার নেতিবাচক দিকগুলোকে বড় করে দেখতে পারেন। বিশদভাবে না জানার কারণে মন্তব্য করা মুশকিল। তবে কিছুকিছু বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকলে কেন একজন ব্যবসায়ী হতে পারবেন না, তা আমার বোধগম্য নয়।
কালবেলা: একজন ব্যবসায়ীর গভর্নর হওয়ায় ‘স্বার্থের সংঘাতে’র কোনো ঝুঁকি দেখেন কি?
সাজ্জাদ জহির: ‘স্বার্থের সংঘাত’ বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের বিষয়টি নিয়ে আমি কয়েক জায়গায় আলাপ করেছি। তিনি একটি নির্দিষ্ট ঋণ নিয়েছেন এবং সংবাদ মাধ্যমে দেখেছি যে সেই ঋণের প্রেক্ষিতে পুনঃতফসিলীকরণ বা কিছু সুবিধা দেওয়া হয়েছে। নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনা থেকেই যায়।
বিশেষত, ব্যক্তি-স্বার্থের জন্য ক্ষমতা আরোপ করে নীতি পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত যেদেশে অঢেল।
তবে আমাদের সমাজে স্বার্থ-বিহীন লোক খুঁজে পাওয়া প্রায়-অসম্ভব। উপরন্তু, এই সমাজের বহুবিধ সম্পর্ক একে অপরের সঙ্গে এত নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে যে প্রতিটি নিয়োগের ক্ষেত্রে কোন না কোন সংঘাত দেখানো সম্ভব। তাই ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় না করে, ভাবা প্রয়োজন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এমন কী ধরনের মেকানিজম থাকা দরকার যার মাধ্যমে এই ধরনের স্বার্থের সংঘাতকে প্রশমিত করা যায়। এর জন্য অবশ্যই অংশগ্রহণমূলক ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, উন্মুক্ততা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
কালবেলা: বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা প্রায়ই গভর্নর বা প্রশাসনের বিরুদ্ধে নীতিগত বিষয়েও আন্দোলন করেন। বিষয়টি কীভাবে দেখেন?
সাজ্জাদ জহির: এটি আমাদের একটি সাধারণ সাংস্কৃতিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত রাজনৈতিক দল এবং নেতৃত্বের ভেতরের চর্চাতে যে অধঃপতন ঘটেছে, এটি তারই প্রতিফলন। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমনটা তখনই হয় যখন বাইরের কোনো সংস্থা বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তকে নিজেদের পক্ষে প্রভাবিত করতে চায়। বিশেষ করে কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি নিজেদের এসব প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে না পারে, তবে তা একটি বিপজ্জনক সংকেত।
কালবেলা: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা হলেও দলীয়করণ বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর পরিণতি কী হতে পারে?
সাজ্জাদ জহির: কাগজেকলমে স্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠার চাইতে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে তথ্য ও যুক্তি-নির্ভর সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রেক্ষিতে জবাবদিহিতা। সেই চর্চ্চা কার্যকর করতে যেসকল বাঁধা আসে তা থেকে সুরক্ষার প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা বেশী জরুরী। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে যে ‘দলীয়করণ’-এর প্রক্রিয়া চলছে, তা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। ব্যাংকিং খাতেও যদি কেউ খোঁজ নিতে শুরু করে, দেখা যাবে—একটি সরকার ব্যবস্থায় যিনি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হয়ে এলেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সরে গেলেন এবং নতুন আরেকজন এলেন। আপাতদৃষ্টিতে দুই দলের মনে হলেও ভেতরে ভেতরে হয়তো তাদের মধ্যে একটি আঁতাত রয়ে গেছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি এই বিষয়টি অনুধাবন করতে না পারে, তবে একজন এসে বলবে, ‘আগেরজন লুট করে নিয়ে গেছে, তাই আমাকে টাকা দাও।’ আবার সে চলে গেলে নতুনজন এসে বলবে, ‘আগেরজন লুট করেছে, এবার আমাকে টাকা দাও।’ এটি তো সরকারি রাজস্ব এবং জনগণের টাকা, এভাবে তা নষ্ট হতে দেওয়া যায় না।
কালবেলা: আপনি নিজেও কিছুদিন একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন। কিন্তু দ্রুতই পদত্যাগ করেছিলেন। এর পেছনের কারণ কী ছিল?
সাজ্জাদ জহির: ২০২৪-এর সেপ্টেম্বরের শুরুতে অনেক স্বপ্ন নিয়ে একটি ব্যাংকের পর্ষদে যোগ দিয়েছিলাম। আগের এমডি চলে যাওয়ার পর কাজের জন্য একটি উন্মুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেখানে গিয়েই প্রথম ধাক্কায় অনুধাবন করতে পারি, ৫ই আগস্টের আগে কী বিশাল অংকের লুটপাট হয়েছে।
শুরুতেই একটি বিষয় লক্ষ্য করলাম, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাব প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে কতটা প্রকট। এক পক্ষ চলে গেলে অন্য পক্ষ এসে জায়গা দখল করবে এই আশংকায় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে পর্ষদকে পর্যন্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মারাত্মক দ্বিধায় পড়তে দেখেছি। এই ‘কাকে তুষ্ট করব আর কাকে করব না’ বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানকেই সংক্রমিত করেছিল। অথচ, এই দুই পক্ষের আপাতঃদৃশ্যমান বৈরী সম্পর্ক বহুলাংশেই ভ্রান্ত থেকেছে।
কালবেলা: সংকট উত্তরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা নতুন পর্ষদের একটি বড় ভূমিকা পালনের কথা ছিল। সেখানে মূল প্রতিবন্ধকতা কোথায় ছিল?
সাজ্জাদ জহির: আমার মনে হয়েছিল, এই সময়ে ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ ত্রুটিগুলো দূর করে পেশাদারিত্বের সঙ্গে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি সুযোগ ছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেসবের জন্য প্রস্তুত ছিল না। বিভিন্ন ব্যাংকে নতুন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হলেও, তাদের মধ্যে বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে ধারণার আদান-প্রদান বা সমন্বয়ের কোনো উদ্যোগ ছিল না।
পর্ষদের সদস্য হিসেবে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সব তথ্যে আমার প্রাপ্তির নাগালে (অ্যাক্সেস) থাকা জরুরি ছিল। কিন্তু আমি তা পাইনি। পরিহাসের বিষয় হলো, প্রাক্তন এক গভর্নর আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনাকে হয়তো বিশ্বাস করলাম, কিন্তু এমন অনেক পর্ষদ সদস্য আছেন, যারা এসব গোপন তথ্য ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবেন।’ এই অবিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে ম্যানেজমেন্ট নিজেদের স্বার্থ গুছিয়ে নিতে পারে এবং সম্ভবত সে কারণেই আইনের প্যাচ আজও রয়ে গেছে। ওপরের পর্যায় থেকে যে সুস্পষ্ট, কঠোর ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত আসা প্রয়োজন ছিল, তা আমি দেখতে পাইনি। নির্দিষ্ট সময়ের কারণে এসব বিষয় জনসমক্ষে আনা সম্ভব হয়নি। একইসাথে নিষ্ক্রিয় থেকে অনেক পদক্ষেপ মেনে নেয়াও সম্ভব ছিলনা। অঙ্গীকারের কারণে আজো সেসবের অনেক কথা প্রকাশ্যে আলোচনা সম্ভব নয়।
কালবেলা: সম্প্রতি পাঁচটি ইসলামি ব্যাংক একীভূত করে একটি নতুন ব্যাংক গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?
সাজ্জাদ জহির: মার্জার, অর্থাৎ একত্রীভূত করার প্রক্রিয়াটি এখনো যথাযথভাবে এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। আমানতকারীদের প্রতিক্রিয়া শুনে একথা বলছি। মার্জার প্রক্রিয়াটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করার জন্য একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপক গোষ্ঠীকে সকল দায়ভার নেয়া বা দেয়া প্রয়োজন। এই স্বত্ব প্রতিষ্ঠায় অসম্পূর্ণতা রয়ে গেছে। শুরুর দিকের সমন্বয়হীনতা দূর করার লক্ষ্যে পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু ধারাবাহিক পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু ট্রাস্টি হিসেবে আরও সুচিন্তিত ও সক্রিয় উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। বিশেষত, সুনির্দিষ্ট বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ এবং তার স্বত্ব গ্রহণে আগ্রহী, নৈতিক ও পেশাগত ভাবে যোগ্য পর্ষদ।
কালবেলা: ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
সাজ্জাদ জহির: সত্যি বলতে, আমাদের দেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ধারণাটি বেশ জটিল ও বিকৃত রূপ নিয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূল নির্যাস হলো এটি একটি সুদমুক্ত ‘ইকুইটি শেয়ারিং’ বা লাভ-লোকসান ভাগাভাগির ব্যবস্থা। কিন্তু বাস্তবে ব্যাংক বা গ্রাহক—কেউই এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করেনি। গ্রাহকদের মানসিকতা হলো, তারা ইসলামী ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলে সুদ থেকে দূরে থাকতে চান ঠিকই, কিন্তু পাশাপাশি প্রচলিত ব্যাংকের কাছাকাছি একটি ন্যূনতম মুনাফাও প্রত্যাশা করেন। হালাল পণ্যের ক্ষেত্রে আমরা যেমন বাড়তি মূল্য দিই, তেমনি সুদবিহীন অ্যাকাউন্টের নামে গ্রাহকের ওপর পরোক্ষ প্রিমিয়াম চাপানো হয়। আমাদের সমাজে নিজেদের বোকা বানানোর যে প্রবণতা রয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে না এলে ব্যবসায়ীরা এর সুযোগ নেবেই।
কালবেলা: নতুন সরকার, নতুন অর্থ উপদেষ্টা ও নতুন গভর্নরের কাছে অর্থনীতির উন্নয়নে আপনার পরামর্শ কী?
সাজ্জাদ জহির: অর্থ মন্ত্রী ও উপদেষ্টার ভাবনার তালিকায় বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অনেক বিষয় রয়েছে – তাই নতুন কোন পরামর্শ থেকে বিরত থাকবো। তবে ব্যাংকিং খাত ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের করণীয় সম্পর্কে কয়েকটি মত রয়েছে।
প্রথমত, অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও জনবল পরিকল্পনা: যেকোনো প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন আনতে হলে সেই উদ্যোগ ভেতর থেকে আসতে হবে। বাইরে থেকে চাপিয়ে দিয়ে বা বিদেশি পরামর্শক দিয়ে এটি সম্ভব নয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত জনবল প্রতিষ্ঠানে স্থূলতা আনে এবং তা কর্ম-পরিবেশকে বিনষ্ট করে। স্বদেশ-ভাবনায় উজ্জীবিত পেশায় চৌকশ জনবল গড়ে তোলার প্রথম পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং সুশাসন ও ‘মালিকানা’র ধারণা থেকে মুক্তি: সবকিছুর আগে ব্যাংকিং খাতের গভার্নেন্স ঠিক করতেই হবে এবং মৌলিক ইন্টিগ্রিটি সম্পন্ন মানুষদের নেতৃত্বে আনতে হবে। আমাদের অর্থনীতি আর নতুন করে কোনো ‘পুকুরচুরি’র ধকল সইতে পারবে না। পশ্চিমা ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে ব্যাংকের মালিকানা স্বত্ব সম্পর্কে পুনর্ভাবনা দরকার। লুটেরাদের পুনরায় আগমন ঠেকাতে হলে বেতন-কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানিক সংস্কার আবশ্যিক।
তৃতীয়ত, মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগ: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দোহাই দিয়ে সুদের হার বাড়িয়ে রেখে প্রকৃত বিনিয়োগকে দমিয়ে রাখা ঠিক নয়। একইসাথে মনে রাখতে হবে, ব্যাংক থেকে ঋণ দিলেই তা সরাসরি বিনিয়োগ হয়ে যায় না। বিনিয়োগ বাড়াতে প্রযুক্তি, ইকুইটি অংশগ্রহণে উদ্ভাবনী চিন্তার অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং ব্যাংক-ফাইন্যান্সিংয়ের সমন্বয় ঘটাতে হবে।
ড. সাজ্জাদ জহির: অর্থনীতিবিদ; নির্বাহী পরিচালক, ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ (ইআরজি)
sajjadzohir@gmail.com
Source: https://www.kalbela.com/ajkerpatrika/joto-mot-toto-path/273695