বণিক বার্তা |
সম্পাদকীয় |
নির্বাচনী প্রতিক্রিয়া|
|
সাজ্জাদ জহির |
যারা দেশী-বিদেশী নানা সমীকরণ বুঝে জানা-অজানা বহুবিধ শক্তি-অপশক্তির ভারসম্য বজায় রেখে নির্বাচিত হতে পেরেছেন, তাদেরকে রাজনীতির বিষয়ে জ্ঞান দেয়া অর্বাচীনতার প্রকাশ হবে। তবে যে লক্ষণগুলো আমাদের সমাজ ও রাজনীতিতে বারংবার ঘটতে দেখা যায়, সেগুলো স্মরণ করা প্রয়োজন।
দীর্ঘদিন পর ভোটের আমেজে তরুণদের ভাসতে দেখে ভালো লেগেছে। তবে, রিসেট বাটনের মোহ থেকে তারা বেরুতে না পারলেও ঝানু দলীয় রাজনীতিবিদদের ফিরে আসার ব্যাখ্যা জাতির কাছে এখনও অস্পষ্ট। অবশ্য জাতি, দেশ, সার্বভৌমত্ব এবং সেসবের আলোকে রাষ্ট্র বিনির্মানের পুরনো ভাবনাগুলো দ্বৈত-বশ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের চালিত ‘গণতন্ত্র’-এর জোয়ারে ম্লান হয়ে পড়েছে। তাই সংশয় জাগে, আবারো কি আমরা সেই (পিচ্চি-পাচ্চা) ইন্সি-উইন্সি মাকড়সার মত উপরে উঠা ও পিছলে পড়ার বিরামহীন ফাঁদে আটকে পড়লাম? একটা নল বেয়ে মাকড়সাটি যতবার উপরে উঠতে চেষ্টা করছিলো, বৃষ্টির জল তাকে ফের গোড়াতে নামিয়ে দিচ্ছিল। তার মত আমাদেরও কি নতুন সূর্যের অপেক্ষায় থাকতে হবে যার আলোয় পিচ্ছিলতা কাটবে এবং আমরা ঝরঝরা শরীর (ও মন) নিয়ে উপরে উঠতে আবারো উদ্যোগী হবো? না কি ইতিহাসকে ভুল প্রমাণিত করে নিরঙ্কুশ বিজয়ীদল ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে, নতুন প্রজন্মের সাথে হাত মিলিয়ে স্বদেশ গড়ার কাজে উদ্যোগী হবে? এই সংশয় নিয়েই কয়েকটি ভাবনা তুলে ধরলাম।
যারা দেশী-বিদেশী নানা সমীকরণ বুঝে জানা-অজানা বহুবিধ শক্তি-অপশক্তির ভারসম্য বজায় রেখে নির্বাচিত হতে পেরেছেন, তাদেরকে রাজনীতির বিষয়ে জ্ঞান দেয়া অর্বাচীনতার প্রকাশ হবে। তবে যে লক্ষণগুলো আমাদের সমাজ ও রাজনীতিতে বারংবার ঘটতে দেখা যায়, সেগুলো স্মরণ করা প্রয়োজন – এখানে মাত্র চারটি লক্ষণের উল্লেখ করে সম্ভাব্য প্রতিকারের পথ খুঁজবো।
(১) প্রথন লক্ষণঃ সামরিক শাসনের বিকল্প হিসেবে পরিবারতন্ত্রের পুনরাবির্ভাব যেন চিরন্তন সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে! সেটা দুঃখজনক হলেও, চালিকার ভূমিকায় বহিঃস্বার্থের প্রাধান্য থাকলে, স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং যৌথ নেতৃত্ব সৃষ্টি বাধাগ্রস্থ হয়। এটা অনস্বীকার্য যে, ভোটাধিকার প্রয়োগে সংসদ নির্বাচন এদেশে স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায় ১৯৭০ থেকে ২০২৬ অবধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে সেটাকে গণতন্ত্রের বায়বীয় রূপ দিয়ে অন্ধ থাকলে আমরা ভুলতে বসবো যে বাস্তবে সেই গণতান্ত্রিক চর্চা কেবলমাত্র একটি মুহূর্তকে ধারণ করে। পক্ষান্তরে, বাজার ও সমাজে সিন্ডিকেট-সম সংগঠন দানা বাঁধাটাই স্বাভাবিক নিয়ম। এবং সে কারণেই, ক্ষণেকের গণতান্ত্রিক কর্মকান্ডও কলুষিত হতে পারে, যার কিছু নমুনা, যত স্বল্পই হোক, আমরা এবারকার নির্বাচনে দেখেছি।
সিন্ডিকেটের প্রতিস্থাপন যেখানে অনিবার্য, নাগরিক হিসেবে খারাপ সিন্ডিকেটের বিপক্ষে ভালো সিন্ডিকেটের আগমন-অপেক্ষায় থেকেছি। [২৮শে জুন ২০২৪ তারিখে বণিক বার্তায় প্রকাশিত “সিন্ডিকেট শুধুই কি বিধিসংস্থা ও সরকারের ব্যর্থতা ঢাকার আবরণ” নিবন্ধে এর ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে।) এই সমীকরণে বাইরের স্বার্থের মতের মিলন যে অভ্যন্তরের সিন্ডিকেটগুলোকে সমধর্মী করে তুলতে পারে, তা দৃষ্টির আড়ালে ছিল। মারিও পুজো’র ‘গড ফাদার’ উপন্যাস থেকে বুঝি সিন্ডিকেট টিকিয়ে রাখার জন্য পরিবারতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আজ তাই নাগরিক-ভাবনাকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
(২) দ্বিতীয় লক্ষণঃ রাজনীতি, বাজার ও সম্পদের উপর কর্তৃত্ব স্থাপনের ক্ষেত্রে পেশী-শক্তির একচ্ছত্র আধিপত্য। তাই আইন, বিচার বিভাগ, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, প্রশাসন, ইত্যাদিকে স্বাধীন বা স্বায়ত্ত্বশাসিত আখ্যা দেয়া নামসর্বস্ব। বরং সম্পদশালীরা পেশীশক্তি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সেসবগুলোকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারে উদ্যোগী হয়। এই লোভের (লাভ-এর নয়) প্রতিযোগিতায় অনৈতিক কর্মকান্ডকে আইনানুগ রূপ দিতে যেসকল পেশাজীবী সহায়কের ভূমিকা পালন করে, প্রাপ্যতার নিরিখে তাদের সেবারও দাম বৃদ্ধি পেতে থাকে। এর জ্বলন্ত উদহারণ দেখা গেছে ব্যাংক খাতে, যেখানে অর্থ লোপাটের ফলে দেউলিয়া ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের ভোগান্তি বেড়েছে। অথচ সেই লোপাটকালেই ব্যাংক-কর্মকর্তাদের সর্বাধিক বেতন-বৃদ্ধি পেয়েছিল। একই প্রবণতা দেখা যায় প্রশাসন খাতে – বিশেষত যখন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, তাদের দোসর হিসেবে সরকারী কর্মকর্তাদের বেতনবৃদ্ধির চাপও বৃদ্ধি পায়। বিশ্লেষণের ব্যাপ্তি বাড়ালে সেই তালিকায় অর্থনীতিবিদ সহ নাগরিক সমাজের অনেক পেশাই অন্তর্ভুক্ত হবে।
অশুভ প্রতিযোগিতায় রাশ টানার জন্য দুটো পদক্ষেপ জরুরীঃ (১) বিত্তবানদের স্বল্পকালীন লাভের সুযোগ সীমিত করা, এবং (২) এই ভূখণ্ডে বর্তমানের অশুভ প্রতিযোগিতার সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদী নারকীয় পরিণতি সম্পর্কে বিত্তবানদের কার্যকর সম্মিলিত উপলব্ধি, যা বৈরী বহিঃস্বার্থের বিরুদ্ধে সমাজ ও রাজনীতিকে ঐক্যবদ্ধ করবে। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?
নতুন যাত্রার শুরুতে যুক্তি-তর্ক ভুলে আশা করতে চাইবো যে, উল্লেখিত প্রথম পাপটি ক্ষমতায় আগত রাজনৈতিক দল বরদাস্ত করবে না। অর্থাৎ, তারা ক্ষমতাকে ব্যবহার করে চুক্তি, ক্রয় বা নিয়োগ বাণিজ্যে লিপ্ত হবেনা, চাঁদাবাজিকে শূন্যে নামাবে, ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় পুরনো পাপের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে না, এবং বিদেশের সাথে অসম চুক্তি করে দেশের সম্পদ পাচারে লিপ্ত হবে না। আদি পাপ থেকে সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতিকে মুক্ত করার সদিচ্ছা আছে কি না, তা প্রকাশ পাবে সরকারের বেতন ও নাগরিক নীতিতে ও সেসবের বাস্তবায়নে। নিম্নে এদুটো প্রস্তাবনার ব্যাখ্যা দেয়া হলো।
যে জনগণের ভোটে সরকার এসেছে, তাদের অধিকাংশ মূদ্রাস্ফীতি-বেতনবৃদ্ধির চক্রাকারের সুবিধা থেকে কেবল বঞ্চিতই নয়, সেই চক্রাকারে মূল্য বৃদ্ধি তাদেরকে আরও নিঃশেষ করে। তাই বেতনবৃদ্ধিতে রাশ টানা জরুরী। এমনকি, সম্ভব হলে, সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাতের সীমা বেঁধে দেয়া যেতে পারে। প্রতিযোগিতা ও দক্ষতার দোহাই দিয়ে আকাশচুম্বী বেতন নির্ধারণের যে রীতি কোন কোন খাতে চালু রয়েছে, তার নেতিবাচক পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া সম্ভবত এর দক্ষতা-বর্ধনকারী ইতিবাচক ভূমিকাকেও হার মানায়। যদি দক্ষ মানবসম্পদের অপ্রতুলতার দোহাই দিয়ে অধিক বেতনের পক্ষে সাফাই গাই, সেক্ষেত্রে অনর্জিত আয়ের উপর অধিকমাত্রায় আয়কর আরোপ যৌক্তিক। ভেবে দেখা প্রয়োজন যে, অধিক বেতন দিলে তা যে মাত্রায় দেশান্তর ও অর্থ-পাচারকে উদ্বুদ্ধ করে, সেই একই মাত্রায় পরিমিত বেতন কি মানবসম্পদের দেশান্তর ঘটায়? বেতনের বাইরে ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে অধিক লাভ আয়-বণ্টনে বৈষম্য আনতে পারে, এবং সে ক্ষেত্রেও, প্রয়োজনীয় বিধির মাধ্যমে মুনাফাকে ভোগ থেকে বিনিয়োগে প্রবাহিত করা সম্ভব। শেষোক্তটির ক্ষেত্রে কর-নীতি ও কর-বহির্ভূত রাজস্ব সংগ্রহের সম্ভাবনা পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে।
বিগত প্রায় তিন বছর আমার লেখায় নাগরিক নীতির সাধারণ ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্র ও নাগরিকত্ব দুটো অবিচ্ছেদ্য ধারণা, যা মূর্ত রূপ পায় ‘নাগরিক’ এর আইনি সংজ্ঞায় ও তাদের চিহ্নিত করার বাস্তব পদক্ষেপে। শেষোক্ত ধারণার সাথে জড়িয়ে আছে ব্যক্তির কর দেয়ার বাধ্য-বাধকতা যা তাকে রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধ রাখে। হঠাৎ উড়ে এসে জুড়ে বসা দ্বৈত-নাগরিকদের দায়বদ্ধতা থাকে না এবং সিদ্ধান্ত-গ্রহণে তারা দেশের ভৌগলিক সীমানার সুদূরপ্রসারী ভালোমন্দ যথার্থ সুবিচার করতে ব্যর্থ হয়। একই সম্ভাবনা রয়েছে যারা নীতির বারোটা বাজিয়ে অথবা ব্যাংকের অর্থ লোপাট করে ভিনদেশের নাগরিকত্বের আশ্রয় নেয়। বিগত বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতি প্রণয়ন জরুরী। নির্বাচন কমিশনের শিথিলতার কারণে যদি সংসদে দ্বৈত নাগরিকের অনুপ্রবেশ ঘটে থাকে, তা শুরুতেই যাচাই-বাছাই করে শোধরানো প্রয়োজন। একইভাবে প্রয়োজন, ঋণ-খেলাপীদের সংসদে অংশগ্রহণ থেকে বারিত রাখা।
(৩) তৃতীয় লক্ষণঃ এই নির্বাচন অবধি, দুঃখজনকভাবে, অর্থ দিয়ে জনসভায় লোক আনতে দেখা গেছে। টেলিভিশনের পর্দায় বিশাল সভা দেখে যদি আমরা প্রভাবান্বিত হই, দোষটা আমাদের। তবে মনে হয়েছে যে, পাড়া/মহল্লা পর্যায়ে পেশীশক্তি লালন করা, বর্তমান ‘রাজনৈতিক বন্দোবস্তে’র অন্তর্নিহিত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অর্থাৎ, এতদিন সময় ও শ্রম ক্ষেপণ করে আমরা মৌলিক বন্দোবস্তে কোনো পরিবর্তন আনতে পারিনি। চলমান এই বন্দোবস্তের সাথে অদক্ষ মানবসম্পদ, কর্মসংস্থানের অভাব ও চাঁদাবাজি জড়িত, ক্ষমতা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ জড়িত, এবং আত্ম-মর্যাদাহীন পরমুখাপেক্ষিতা ও বহিঃশক্তির উপর নির্ভরশীলতা আষ্টে-পৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে।
(৪) চতুর্থ লক্ষণঃ ব্যক্তি অপরাধ করে, অথচ, দলের দোহাই দিয়ে ব্যক্তি-অপরাধের বিচার ও শাস্তি বিলম্ব করা হয়। এজাতীয় চর্চা ন্যায়-ভিত্তিক রাষ্ট্র-গঠনের এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পরিপন্থী। দলকে অন্তর্ভুক্ত করতে যেয়ে ব্যক্তি-অপরাধীকে নির্বিচারে প্রশ্রয় দেয়া যেমন কাম্য নয়, একইভাবে, ব্যক্তি-অপরাধে দুষ্ট একটি দলকে বেআইনি ঘোষণা করে একজন নিরপরাধ রাজনৈতিক কর্মীকে আমরা দোষী সাব্যস্ত করতে বা বিধিসম্মত কাজ করায় বাঁধা দিতে পারিনা।
আমদানিকৃত রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে এক বছরের অধিককাল ব্যস্ত থাকায় তার রেশ এই নিবন্ধে রয়ে গেছে। এটা অনস্বীকার্য যে বিভাজিত বশ্যতা-সম্পন্ন অনেকেই গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় ভালোমন্দ ভূমিকা রেখেছে। তবে নতুন নেতৃত্ব সত্যিকার অর্থে স্বাধীন দেশ ও বাংলা ভাষা-কেন্দ্রিক জাতিগোষ্ঠী গড়ে তুলতে সংকল্পবদ্ধ থাকলে, মূল নীতি প্রণয়নে ও কর্মক্ষেত্রে কাণ্ডারির ভূমিকায় প্রবাসী নয়, অনিবাসী ও নিবাসী বাংলাদেশীদের প্রতিস্থাপনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। আমরা ভিনদেশের নাগরিকত্ব নেয়া প্রবাসীদের সবসময় পাশে চাই, কিন্তু রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতার জন্য মূল মঞ্চে অংশগ্রহণ থেকে তাদেরকে বাইরে রাখা প্রয়োজন।
সাজ্জাদ জহির: নির্বাহী পরিচালক, ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ (ইআরজি)
Source: https://bonikbarta.com/editorial/nBNXNrhkDBhySBx3
363