ভোট দিতে যাওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে এক নাগরিকের প্রত্যাশা
December 20, 2023
বাজার উপযোগী শ্রমশক্তি গড়ে তোলার চেয়েও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা রয়েছে
March 9, 2024

‘দ্বৈত নাগরিকত্ব’ নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে আরেকটি খোলা চিঠি

কালবেলা |

মতামত/ চিঠি |

১৯ ডিসেম্বর ২০২৩ |

ড. সাজ্জাদ জহির |

অনেকেই অন্তর্ভুক্তিমূলক না হওয়ার কারণে নির্বাচনের বিরোধিতা করেন অথবা নির্বাচনে ভোট দিতে ইচ্ছুক নন। তারা অন্তর্ভুক্তিকে সংজ্ঞায়িত করেন শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণের প্রেক্ষিতে। নিবন্ধিত অসংখ্য ‘রাজনৈতিক দল’ রয়েছে– সম্ভবত সেই সংজ্ঞায় তাদের সবার অংশগ্রহণ মুখ্য নয়। বরং, ‘অন্তর্ভুক্তি’র দাবির মধ্যে নিহিত রয়েছে কিছু নির্দিষ্ট দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

যদি দলের ভূমিকায় মধ্যসত্ত্বভোগীর রূপ না থাকত, দলমত নির্বিশেষে এবং সব প্রতিদ্বন্দ্বীদের অংশগ্রহণে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার প্রয়োগ কার্যকর করা যেত, সম্ভবত সেটাই সবচাইতে আদর্শ ব্যবস্থা হতে পারত। কিন্তু বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় মানবসমাজকে দলবদ্ধ হতে দেখা যায়, যার প্রতিফলন আমরা রাজনীতির অঙ্গনেও দেখতে পাই। একই কারণে, ফি বা চাঁদা-আদায়কারীর ভূমিকা থেকে দলগুলোকে নিবৃত করা দুরূহ এবং রাজনীতি ও নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে সেসবের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা অধিকতর দুরূহ কাজ। এসবের মাঝে চলমান প্রক্রিয়ায় প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য জনসমক্ষে উন্মুক্ত করা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

একপেশে ভাবে সংজ্ঞায়িত ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ নির্বাচন বা বিমূর্ত গণতন্ত্রের প্রতি অন্ধ-ভালোবাসা বা বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর সীমাবদ্ধতা ঘিরে সংশয় -এসবের কোনোটিই ভোট দিতে দ্বিধান্বিত হওয়ার কারণ নয়। বরং, প্রার্থীদের ‘বৈধতা’ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমের প্রতি সংশয় থাকায় ভোট দিতে দ্বিধা জেগেছে।

সংবাদমাধ্যমে জেনে আশান্বিত হয়েছিলাম, গুটিকতক নির্বাচনী এলাকায় ভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব (দ্বৈত নাগরিকত্ব) থাকার কারণে প্রার্থিতা খারিজ করা হয়েছে। অথচ ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য ঘাঁটলে দেখা যায়, অনেক এলাকায় এই নিয়মটি কার্যকর করা হয়নি এবং পর্যাপ্ত যাচাইয়ের জন্য অন্যান্য তথ্যে অসম্পূর্ণতা পাওয়া যায়। তাই ধারণা করা যায়, নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থাপনায় সুষ্ঠ নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ঘাটতি রয়ে গেছে।

যে দুটো নির্দিষ্ট কারণে বর্তমান অগ্রগতির প্রেক্ষিতে আমি ভোট দিতে দ্বিধান্বিত, তার বিবরণ নিম্নে দিলাম-

১. প্রতিজন প্রার্থী থেকে পাওয়া তথ্যসমূহ ৩টি প্রধান ভাগে ওয়েবসাইটে (http://103.183.38.66/) পাওয়া যায়। এর মধ্যে হলফনামা (affidavit) সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, যা শেষ ৩টি সারির প্রথমটির তথ্যে দেওয়া আছে। সেখানে শিক্ষাসংক্রান্ত তথ্য, ফৌজদারি মামলায় পূর্বে জড়িত থাকা (বা না থাকার) স্বীকারোক্তি এবং নির্বাচনের খরচ কীভাবে মেটানো হবে, সে সম্পর্কে তথ্য রয়েছে। প্রার্থীর যোগ্যতা নির্ধারণ এবং ভোটারদের সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এ জাতীয় তথ্য সহায়ক হতে পারে। এমনকি (ব্যাংক) ঋণ খেলাপিকে অযোগ্য চিহ্নিত করার বিধি (রুল), যদিও কাঙ্ক্ষিত, সংসদীয় নির্বাচন পরিচালনার জন্য সাংবিধানিকভাবে তা (আমার জানামতে) বাধ্যতামূলক নয়। এসব গৌণ বিষয়াদি হলফনামায় অন্তর্ভুক্ত থাকা সত্ত্বেও, সংসদ-সদস্য হওয়ার মূল পূর্বশর্ত হিসেবে একমাত্র বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার যে বিধান সংবিধানে রয়েছে, তা নিশ্চিত করার জন্য হলফনামায় প্রয়োজনীয় তথ্য ও বিবৃতি চাওয়া হয়নি! অর্থাৎ, একজন প্রার্থিতা-প্রত্যাশী ব্যক্তি যে অন্য কোনো দেশের নাগরিক নন, সেই মর্মে একটি অঙ্গীকারনামা এবং তা থেকে ব্যত্যয় ঘটলে নির্বাচন-পরবর্তী পদ খারিজ হবার সতর্কবাণী, হলফনামায় উল্লেখ করা আবশ্যিক ছিল। অপর্যাপ্ত যাচাইবাছাই সম্পর্কে জানার পর, দেশের সংসদে একজন ‘বিদেশি’কে নির্বাচন করার প্রক্রিয়াকে সহজ করে দিয়ে দেশের সংবিধান লঙ্ঘনের অপরাধে শরিক হতে আমি দ্বিধান্বিত।

২. দাখিলের অন্য দুটি তথ্যের মধ্যে, আয়কর রিটার্ন/সনদপত্র (সারিগুচ্ছের তৃতীয়) গুরুত্বপূর্ণ যা সঠিকভাবে পেলে নির্বাচন কমিশন অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে সঙ্গতি যাচাই করে প্রার্থিতার বৈধতা নির্ণয় করতে পারে। তথ্য নিরীক্ষা করে জানা যায়, প্রার্থীদের অনেকে আয়কর দাখিলের সব কাগজপত্রের সত্যায়িত অনুলিপি জমা দিয়েছেন। এমনকি তারা সেই দাখিলের প্রাপ্তি রশিদ জমা দিয়েছেন, যেখানে মোট আয়, দেওয়া কর এবং নিট-সম্পদ মূল্যের উল্লেখ রয়েছে। ব্যতিক্রম দেখা যায় কিছুকিছু প্রার্থীর ক্ষেত্রে, যাদের দাখিলকৃত আয়করসংক্রান্ত তথ্যাদি অসম্পূর্ণতায় ভরপুর। তাদের আয়কর সনদপত্রে ২০২২-২৩ সনের আয়, দেওয়া কর এবং সম্পদের মূল্যের উল্লেখ নেই। এমনকি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে, জমাকৃত কম-প্রয়োজনীয় (বা অপ্রয়োজনীয়) এক পৃষ্ঠাকে সম্পূর্ণ আয়কর দাখিলের (ট্যাক্স রিটার্ন্স) স্থলে গ্রহণ করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে।

লক্ষণীয়, জমাকৃত প্রার্থীভিত্তিক উপাত্ত সম্ভবত পিডিএফ বা চিত্র (ইমেজ) ফাইলে রয়েছে। এসব উপাত্ত ডিজিটাইজ (সংখ্যা-রূপী) আকারে সংরক্ষণ না হলে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে স্বল্প সময়ে তথ্য যাচাই করা সম্ভব নয়। এ ছাড়াও কর ও রাজস্ব বিভাগ বা বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার সুযোগ হয় না। অর্থাৎ, আজকের তথাকথিত ডিজিটাল যুগে সনদের (কাগজের) ওপর ভিত্তি করে প্রার্থীদের ‘বৈধতা’ নির্ণয় করতে হচ্ছে। সেগুলোও অনুলিপি, যা মূল সনদের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পরে স্থানীয় (নির্বাচনী এলাকা) পর্যায়ের নির্বাচন কমিশন কর্তৃপক্ষের ওপর! স্বভাবতই সেসব কর্মকর্তাদের পারদর্শিতা প্রার্থীদের যোগ্যতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যে সমাজে ক্ষমতার অপব্যবহার নিত্যকার ঘটনা, নির্বিচারে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়াকে সহ্য করা হয়, যেখানে ওয়েব প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষিত উপাত্তকে ‘ডিজিটাল’ বলে প্রচার করা হয় এবং সেসব উপাত্তের বিশ্লেষণের উদ্যোগ যেখানে সীমিত; সেদেশে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, নির্বাচন কমিশন হাতে-গোনা কয়েকজনকে মাত্র দ্বৈত নাগরিক চিহ্নিত করে তাদের প্রার্থিতা বাতিল করতে পেরেছে। তবে লক্ষণীয়, একই নির্বাচনী এলাকায় কিছু শক্তিশালী বিরোধীপক্ষ থাকার ফলেই সেটা সম্ভব হয়েছে। অথবা, ভিন্নভাবে বললে, ‘দ্বৈত নাগরিকত্ব’-এর আইনি হাতিয়ারটি বিশেষ বিশেষ নির্বাচনী এলাকায় ব্যবহৃত হয়েছে!

জাতীয় সংসদের যে কোনো নির্বাচনে একজন ভোটার হিসেবে আশা করেছিলাম, নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এক গুচ্ছ (সাংবিধানিকভাবে) বৈধ এবং (বিধিভিত্তিক) যোগ্য প্রার্থীদের তালিকা (শিডিউল) ভোটারদের সামনে উপস্থাপন করবে। দুর্ভাগ্যবশত, বৈধতা যাচাইয়ের জন্য প্রার্থীর বিদেশে নাগরিকত্ব আছে কী নেই, সে সম্পর্কে সরাসরি প্রশ্ন রেখে তথ্য সংগ্রহের কোনো প্রচেষ্টা দৃশ্যমান নয়। এমনকি, প্রত্যেক প্রার্থীর কাছ থেকে হলফনামায় এবং দলীয় প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া রাজনৈতিক দলের (পার্টির) ব্যবস্থাপকদের (নেতা-নেত্রীদের) কাছ থেকে এসংক্রান্ত কোনো অঙ্গীকারনামা নেওয়া হয়নি বলে জেনেছি৷ অথচ প্রাক-নির্বাচনী ত্রুটি দূর করবার জন্য এজাতীয় হলফনামা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ওপরে উল্লেখিত কারণে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধা রয়েই যাবে যদি না নির্বাচন কমিশন অতি-সত্বর নিম্নোক্ত কাজগুলো সম্পাদন করে-

– কারও অভিযোগের জন্য অপেক্ষা না করে এবং সে জাতীয় যুক্তির আশ্রয় না নিয়ে নৈর্ব্যক্তিকভাবে সব প্রার্থীদের বিদেশি নাগরিকত্বের বিষয়টি যাচাই করতে হবে।

– প্রার্থীদের কাছ থেকে হলফনামা (যা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য) নিন যে তারা বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশের নাগরিক নন; এবং

– নিশ্চিত করুন, সব যোগ্য প্রার্থীরা তাদের ট্যাক্স রিটার্নের নোটারাইজড কপি এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) জমা দেওয়ার স্বীকৃতির রসিদ জমা দেন। (এনবিআর-এর কাছে এই জমাগুলোর সঠিকতা যাচাই করা প্রয়োজন।)

– রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে অঙ্গীকারনামা নিন যে তাদের মনোনীত প্রার্থীদের কেউই অন্য কোনো দেশের নাগরিক নন।

দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে আস্থা রাখতে পারে এমন সংসদ নির্বাচন করা থেকে ভোটারদের বঞ্চিত করা অনুচিত এবং সেকারণে সময়ের অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা যেন বিবেকের দংশনে না ভুগে, সাংবিধানিকভাবে বৈধ প্রার্থীদের বাছাই করার উদ্দেশ্যে ভোট দিতে যেতে পারি, তার জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে এবং বৈধ প্রার্থীদের তালিকা (শিডিউল) তৈরি করে জনসমক্ষে আনা জরুরি।

ড. সাজ্জাদ জহির : অর্থনীতিবিদ; নির্বাহী পরিচালক, ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ
[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]

Source: https://www.kalbela.com/opinion/letter/49265

713