‘দ্বৈত নাগরিকত্ব’ নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে আরেকটি খোলা চিঠি
December 20, 2023

বাজার উপযোগী শ্রমশক্তি গড়ে তোলার চেয়েও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা রয়েছে

বণিক বার্তা|

সাক্ষাৎকার |

মার্চ ০৩, ২০২৪ |

 

ড. সাজ্জাদ জহির বাংলাদেশের আর্থসামাজিক নানা প্রসঙ্গ নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম।

 

শিক্ষা দিয়ে কি আগামী দিনের প্রয়োজন মেটানোর মতো লোক তৈরি হচ্ছে, যারা আমাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবেন? 

একজন কেন্দ্রীয় পরিকল্পনাবিদ যদি সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন, তিনি হয়তো সেই অনুযায়ী জনসম্পদের চাহিদা নিরূপণ করতেন এবং যেসব ক্ষেত্রে জনশক্তির ঘাটতি রয়েছে তা মেটানোর উদ্যোগ নিতেন। অতীতে কিছু কিছু দেশে অতি নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্পদের অপব্যবহার দেখা গেছে। তাই অনেকে বাজার ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখেন এবং আশা করেন যে শ্রম চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে মানবসম্পদ গড়ার জন্য ব্যক্তি বিনিয়োগ ঘটবে। তবে প্রযুক্তি পরিবর্তন থেকে উদ্ভূত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও শ্রম চাহিদায় অনিশ্চয়তা, শিক্ষা-সেবার বাজারের অব্যবস্থা এবং স্বল্পমেয়াদি মুনাফা-তাড়িত স্বার্থান্বেষীদের হাত থেকে ব্যক্তিকে রক্ষা করার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ না থাকায়, ব্যক্তি পর্যায়ের বিনিয়োগ (পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাবে) অনেক ক্ষেত্রেই বিপথে চালিত হয়। শিক্ষাঙ্গনে সময়োপযোগী পরিবর্তনের একটি বড় বাধা হলো, গোষ্ঠীস্বার্থের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক জড়তা। অর্থাৎ অতীতের ধারায় গড়ে ওঠা (শিক্ষকসহ) অগ্রজরা নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্যকে বেছে নেয়ার ফলে নতুন ধ্যানধারণা প্রবর্তন ও কার্যক্রম চালু করা দুরূহ হয়। এ ধরনের একটি বহুমুখী সমীকরণে সরলীকৃত কোনো প্রশ্নের দ্বারা শিক্ষার বিষয়টিকে তরলভাবে না দেখে সামগ্রিক প্রক্রিয়া অনুধাবন প্রয়োজন।

বিষয়টি যদি আরেকটু সবিস্তারে বলতেন?

শিক্ষার ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত, যা বিদ্যালয় পাঠের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। এ আলোচনা বিস্তৃতি পায় এবং অধিক জটিল রূপ নেয় যখন প্রশিক্ষণকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়! একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে আমার মনে হয়েছে যে অধিকাংশ মতবিনিময়ে, শিক্ষার দর্শন-বিষয়ক দিকগুলো অনুপস্থিত রয়েছে। বাজারের চাহিদা বুঝে কারিগরি বিদ্যা অর্জন নিঃসন্দেহে আবশ্যিক। কিন্তু একমুখী শ্রমদক্ষতা উন্নয়নের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বাজারে নির্দিষ্ট দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা দ্রুত পরিবর্তনশীল। একজন মানুষ একটি বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেছে, কিন্তু প্রযুক্তি বা চাহিদা পরিবর্তনের ফলে সেটা অচল (অবসোলিট) হয়ে যেতে পারে। অথবা সরবরাহ বিভ্রাটের কারণে নির্দিষ্ট উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হলে বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমের লাভজনক ব্যবহার সম্ভব নাও হতে পারে। এ জাতীয় সংকটে একজন বিশেষভাবে দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তি কী করবেন? অন্যদিকে যেসব মানুষের সহজাত দক্ষতা রয়েছে, অর্থাৎ যার ভিত পরিশীলিত এবং বিভিন্ন পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে যে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন, শ্রমবাজারে তাদের যোগ্যতা অধিকতর টেকসই। এ পার্থক্যটা আমাদের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে অনেক সময় ভুলে যাচ্ছে। একই ধরনের জড়তা (অর্থাৎ সংবেদনশীলতার অভাবে) প্রশিক্ষণদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও ঘটে, যারা অস্তিত্ব রক্ষার্থে পুরনো শিক্ষাক্রম চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়। এসব কারণে এবং তথ্যপ্রযুক্তি সংগ্রহের (যন্ত্রপাতি ক্রয়ের) নামে ‘পুকুর চুরি’ সম্ভব বলে প্রশিক্ষণের বেড়াজালে মূল্যবান সম্পদের অপচয় ঘটে।

বিদ্যমান শিক্ষা কাঠামোয় বাজার উপযোগী শ্রমশক্তি তৈরি সম্ভবপর হবে?

বাজার উপযোগী শ্রমশক্তি গড়ে তোলার চেয়েও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা রয়েছে, সেটি হলো একটি জনগোষ্ঠীর সম্মানজনক আত্মপরিচয় গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন। শিক্ষার মাধ্যমেই একটি দেশের বিভিন্ন জাতিসত্তার ভাষা, ইতিহাস ও দর্শনচিন্তাকে (ধর্মীয়সহ) এক আখ্যানে গ্রথিত করা সম্ভব। ভিন্নমতের সম্মানজনক সহাবস্থান চর্চার মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার (ও শিক্ষা ব্যবস্থার) অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে। একই সঙ্গে অনুধাবন প্রয়োজন যে পৃথিবীতে কিছু কিছু দেশ, জাতি বা স্বার্থগোষ্ঠী রয়েছে, যারা আঞ্চলিক বা বিশ্ব পরিসরে আধিপত্য বিস্তার করার উদ্দেশ্যে ভিন্ন দেশ বা জাতির আত্মপরিচয় গঠনের বিরোধী। সে জাতীয় আগ্রাসনের চরম প্রকাশ দেখা যায় শিক্ষা ও সংস্কৃতির অঙ্গনে, যা সংবলিতভাবে অর্থনৈতিক ও সামরিক আগ্রাসনের (এবং রাজনৈতিক সম্প্রসারণের) পরিপূরক বা সহযোগী ভূমিকা পালন করে। নিজ সত্তা হারিয়ে বিশ্ব পরিসরে কোনো এক শক্তিধর কেন্দ্রের অধীনস্থ হয়ে থাকতে না চাইলে বাজার উপযোগী কারিগরি যোগ্যতা অর্জনে সহায়ক হওয়া ছাড়াও শিক্ষা কার্যক্রমে অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় ও আখ্যানের অন্তর্ভুক্তি প্রতিহত করা প্রয়োজন। তবে অনস্বীকার্য যে ইতিবাচক প্রক্রিয়ায় আত্মপরিচয় গঠনের মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিতকে দূরে রাখা সর্বোত্তম।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, বাংলাদেশ কর্তৃক সপ্তম শ্রেণীর জন্য প্রকাশিত ‘ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান, অনুসন্ধানী পাঠ’, বইটি নিয়ে ২০২৩-এর জানুয়ারিতে বণিক বার্তায় প্রকাশিত একটি নিবন্ধে আপনি প্রশ্ন তুলেছিলেন। এক বছর পর এ সম্পর্কে আপনার মত কী?

সে সময়ে একটি নির্দিষ্ট পাঠ্যপুস্তকে একপেশে উপস্থাপনা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছিলাম। যে শঙ্কাগুলো তখন ছিল, তা আজও আছে। সেসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে আগের বক্তব্যের সঙ্গে সংগতি রেখে, ইতিহাস, ভাষা ও ধর্ম সম্পর্কিত কয়েকটি বিষয়ের প্রতি (পাঠ্যক্রম প্রণেতাদের) দৃষ্টি আকর্ষণ করব।

বৈদিক যুগে (প্রায় ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বে) আর্য নামক জনগোষ্ঠী যখন দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশে আসে, তারও আগে থেকে বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী ভূখণ্ডে জনবসতি ছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীর ইতিহাসের যাত্রাপথ আর্য জনগোষ্ঠীর আগমন দিয়ে শুরু হয়নি। একইভাবে তাদের (উত্তর-পশ্চিম পথে আসা আর্য জনগোষ্ঠীর) ভাষা ও ধর্ম বিশ্বাস এখানকার অতীতের অংশমাত্র। উপমহাদেশের পশ্চিমাঞ্চল থেকে পূর্বাঞ্চলের পার্থক্য বুঝতে এ আদি অবস্থা অনুধাবন করা জরুরি।

বাংলা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের আদি জনগোষ্ঠীর মাঝে একাধিক জাতিসত্তা ছিল। তাদের অনেকেই পশ্চিম থেকে এসেছিল, অনেকে দক্ষিণাঞ্চল থেকে সমুদ্রতীর ঘেঁষে এসেছিল এবং সম্ভবত তাদেরও আগে পাহাড় অঞ্চলে অস্ট্রো-এশীয় গোষ্ঠীর বসবাস ছিল। লিখিত বর্ণমালার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন না পাওয়া গেলেও বিজ্ঞজনদের মাঝে এটা স্বীকৃত যে এ অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব ভাষা ছিল এবং সামাজিক রীতি, বিশ্বাস ও স্রষ্টাকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য আচার-অনুষ্ঠানের রীতি ছিল। এ মন্তব্য উপমহাদেশের অন্যান্য অনেক ভূখণ্ডের জন্যও প্রযোজ্য। বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী ভূখণ্ডের ইতিহাস বুঝতে হলে আসা-যাওয়ার মাঝে থাকা সব জাতিসত্তার বর্ণনা ও বাঙালি সংকরত্বের বিবরণ জানা প্রয়োজন।

পশ্চিমের জনস্রোত বিভিন্ন সময়ে (সহস্রাব্দীতে) ঘটেছে এবং ভিন্ন সময়ে আসা (উপমহাদেশের উত্তর ও পশ্চিমে বসতি নেয়া) জনগোষ্ঠীর (প্রাতিষ্ঠানিক) ধর্ম বিশ্বাসে ভিন্নতা থাকলেও ভাষায় প্রায় অভিন্নতা লক্ষণীয়। ঋগবেদের মাধ্যমে যে জ্ঞানের ভাণ্ডার সংস্কৃত ভাষায় এল, তাতে হিন্দু ধর্মের উল্লেখ ছিল না। তবে এটা অনুমেয় যে উপমহাদেশের বিজিত জনগোষ্ঠীর সংস্পর্শে এসে যে সামাজিক স্তরবিন্যাস সৃষ্টি হয়, তার প্রকাশ ঘটে ধর্মীয় অনুশাসনকে সুসংহত করার মাঝে (খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে রচিত মনু-স্মৃতি বা মনু সংহিতা দ্রষ্টব্য)। আজ সবাই জানেন যে হিন্দি ও উর্দুর মাঝে পার্থক্য অতি নগণ্য। অনুমান করা হয় যে একই ভাষার বাহকরা অভিবাসনের দুটো পথ গান্ধার, আফগানিস্তান (কম্বৌজ) এবং সিরিয়া-ইরান বেছে নেয়ায় এবং পরবর্তীতে হিন্দিতে সংস্কৃতর (নাগরী লিপির) প্রভাব ও উর্দুতে ফারসি লিপির প্রভাব পড়ায় কথনে ও লেখনে দুটো (আপাত) ভিন্ন উপধারা জন্ম নেয়।

আদি পশ্চিমা সম্প্রসারণের আগে থেকে প্রাচীন বাংলা, অসমীয় ও উড়িয়া ভাষার স্বতন্ত্র রূপ ছিল বলে ধারণা করা হয়। তবে গঙ্গা-পদ্মা, যমুনা-ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনার অববাহিকার সমতলে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর আদি ভাষা বাইরে থেকে আসা ভাষার অভিযোজনে এলাকাভিত্তিক কথ্যভাষায় তারতম্য এনেছে বলে অনুমেয়।

রাষ্ট্রীয় পোষণে যে শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠবে তার দার্শনিক ভিত নির্ণয়ের ক্ষেত্রে জাতিসত্তা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের যেকোনো একটিকে মুখ্য হিসেবে বেছে নেয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। এ বিষয়ে চটজলদি কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত না হয়ে আমাদের আত্মপরিচয় নির্ণয়ে বিভিন্ন জটিলতার দিকগুলো সম্যক উপলব্ধিতে আনা প্রয়োজন। মোটাদাগের প্রেক্ষিতটা ২০২১ সালের ২৮ এপ্রিল বণিক বার্তায় প্রকাশিত ‘আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনার সংহতিকালে দুর্বল দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ নিবন্ধে পাওয়া যাবে। সেই আঙ্গিকে বিভিন্ন স্তরে পরিচয় চিহ্নিত করার সম্ভাবনা গুনতিতে নিয়ে জাতিসত্তা, ধর্ম বিশ্বাস ও ভাষা নিয়ে আরো কয়েকটি দিক উল্লেখ করব।

(১) পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তি এবং তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা এ উপমহাদেশের জনগোষ্ঠীকে তিনটি ধর্মে ভাগ করে দেখতে (এবং দেখাতে) চেয়েছিল, হিন্দু, মুসলমান ও শিখ (বিবিসিকে ১৯৫৫ সালে আম্বেদকারের সাক্ষাৎকারে তার স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে)। ভাবতে অবাক লাগে যে আগের ভাবধারায় প্রভাবান্বিত এবং স্পষ্টতই ব্রাহ্মণবাদকে খণ্ডন করে বিকশিত সাম্যবাদী/সমতাকামী (ঋষভ-মহাবীরের) জৈন ধর্ম এবং গৌতম বুদ্ধ প্রবর্তিত বৌদ্ধ ধর্ম, সেই তালিকায় স্থান পায়নি। কার্যত পশ্চিমা শক্তি বিভিন্ন জাতিসত্তা ও ভাষাকে দলিত করে (উপনিবেশ-পরবর্তী সংবিধানে), ইংরেজি ছাড়া (ইন্ডিয়া-পাকিস্তান দেশভেদে) হিন্দি ও উর্দু ভাষাকে সব জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। সেই আলোকে বাংলাদেশের ইতিহাস পাঠে ভাষা আন্দোলনের এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের সুদূরপ্রসারী (পশ্চিমা আধিপত্যবিরোধী) তাৎপর্য অনুধাবন জরুরি।

(২) জাতিসত্তাকেন্দ্রিক আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দুটো দুর্বলতা রয়ে গেছে—ক. সমধর্মী অন্যান্য জাতিসত্তা ও ভাষার সঙ্গে মেলবন্ধন গড়ে তুলতে ব্যর্থতা, বিশেষত অসমীয়া ও উড়িয়া ভাষার সঙ্গে খ. চাপিয়ে দেয়া ভৌগোলিক সীমানার কারণে কোনো কোনো জাতিসত্তার একাংশ বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে (আন্তঃসীমান্তীয় জনগোষ্ঠী) এবং একই সঙ্গে, অনেক ক্ষুদ্র আকারের জাতিসত্তা রয়েছে যারা (সম্ভবত) আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য যথেষ্টভাবে সংঘটিত নয়। সীমান্তের উভয় পাড়ে বসবাসরত এসব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্মানজনক সমঝোতা স্থাপন করার ক্ষেত্রে প্রচণ্ড ঘাটতি রয়ে গেছে।

(৩) মানুষ সমাজবদ্ধ হওয়ার শুরু থেকে যেমন জাতিসত্তা গঠনের ও ভাষার যাত্রা শুরু, একইভাবে সামাজিক রীতি, আচার-আচরণ এবং সামষ্টিক বিশ্বাসবোধ দানা বাঁধতে শুরু করে। কিন্তু স্থানীয় এবং আঞ্চলিক বিশ্বাসবোধ এক বা একাধিক ধর্ম হিসেবে আবির্ভূত হয় যখন সাম্রাজ্যে স্থিতি আনতে বিভিন্ন জাতিসত্তার মাঝে সহাবস্থানের সাধারণ নীতিমালা নৈতিক ও ধর্মীয় বিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। তারই আলোকে যে ধর্মাবলম্বীই হোক না কেন, সময়কালের ব্যবধান ছাড়া, পশ্চিম থেকে আসা শাসকদের উৎপত্তি ও চরিত্রগত দিকে খুব বেশি অমিল পাওয়া যায় না। অনেকে অবশ্য মনে করেন যে দুটো পর্বেই যা প্রথমে সাম্যবাদের ধারণা ও জ্ঞানের ভাণ্ডার নিয়ে এসেছিল, তা পরবর্তী সময়ে বিজিত গোষ্ঠীর অসহায়তার সুযোগ নিয়ে রক্ষণশীল ধ্যান-ধারণার ধারক-বাহকে পর্যবসিত হয়।

পরিশেষে বলব, ওপরের বর্ণনা নির্দিষ্ট ভূসীমা ও তার পশ্চিম থেকে আসা জনগোষ্ঠীকে নিয়েছিল। কিন্তু এদের বাইরেও আরো পশ্চিমে ও পূর্বে অনেক জাতিগোষ্ঠী রয়েছে এবং সেখানকার শাসকগোষ্ঠীরা এ উপমহাদেশে তাদের আধিপত্য বিস্তারে আগ্রহী থাকবে। এ বিশাল অঙ্গনে আমাদের স্থান খুঁজে পেতে হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় স্থাপনের মাধ্যমে অতীতে পশ্চিম থেকে আসা শাসকগোষ্ঠীর ধর্মান্ধ অংশকে পরিশীলিত করা জরুরি। বিভিন্ন জাতিসত্তার মাঝে সম্মানজনক সহাবস্থান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুদৃঢ় ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব, যা সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। তাই নতুন প্রজন্মকে তাদের জাতি পরিচয় ও সংকরত্ব অর্জনের ইতিহাস জানতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন এবং সে ব্যাপারে ব্যক্তি পর্যায়ে শেষ সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব তাদের হাতেই ছেড়ে দেয়া আবশ্যিক। তাই শিক্ষাক্রমে ধর্মান্ধতা বাদ দিয়ে যেমন ধর্মের নির্যাস তুলে ধরা প্রয়োজন, তেমনি ব্যক্তিপূজা বর্জন করে জাতিসত্তা ও বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের বিকাশের ইতিহাস তুলে ধরা জরুরি।

 

ড. সাজ্জাদ জহির অলাভজনক বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের (ইআরজি) নির্বাহী পরিচালক। এর আগে তিনি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়া তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন বিশ্বব্যাংক, আইএফসি, আইএফএডি, ইউনিসেফ, এফএও ও ডব্লিউএফপির মতো প্রতিষ্ঠানে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক শেষ করে পিএইচডি করেছেন কানাডার ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোতে। সাক্ষাৎকার: সাবিদিন ইব্রাহিম। শ্রুতলিখন: দিদারুল হক

Source: https://bonikbarta.net/home/news_description/375323/%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%89%E0%A6%AA%E0%A6%AF%E0%A7%8B%E0%A6%97%E0%A7%80-%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%AE%E0%A6%B6%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BF-%E0%A6%97%E0%A7%9C%E0%A7%87-%E0%A6%A4%E0%A7%8B%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%9A%E0%A7%87%E0%A7%9F%E0%A7%87%E0%A6%93-%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%97%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%AA%E0%A7%82%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A3-%E0%A6%8F%E0%A6%95%E0%A6%9F%E0%A6%BF-%E0%A6%AD%E0%A7%82%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%BE-%E0%A6%B0%E0%A7%9F%E0%A7%87%E0%A6%9B%E0%A7%87

83