In Search of a brain in the body
September 24, 2014
আবাসন খাতের শ্রমবাজার-এর বিবর্তন
March 1, 2018

শিক্ষার অধোগতিঃ জ্ঞান ও শিক্ষা থেকে ফটোকপিয়ার

(দৈনিক বণিকবার্তা, ১১ইডিসেম্বর ২০১৩ তারিখে প্রকাশিত)

প্রারম্ভিক:

হুদিন আগে মোড়লগঞ্জে কয়েকজনস্কুল-ছাত্রীর সাথে সৃজনশীল শিক্ষা প্রসঙ্গে আলোচনার সুযোগ হয়েছিল। সৃজনশীলতারসংজ্ঞা দিতে গিয়ে আমরা মুখস্তবিদ্যা-কে ফটোকপিয়ার-এর সাথে তুলনা করেছিলাম। তবে দুটোর মাঝে কিছুটা ফারাকআছে। কোনও বিষয়-বস্তুমুখস্ত করতে আমাদের সচেতন প্রয়াস নিতে হয়। আবারো, অনেক সময় সেই প্রয়াস-প্রক্রিয়ায় আমাদেরমস্তিষ্কে সুনির্দিষ্ট প্রোগ্রাম (পূর্বলেখন) দাঁড়িয়ে যায়, যা বেশ সহজাতভাবে, যেনঅজান্তে, আমাদের মস্তিষ্ককে এড়িয়ে, দৃষ্টি (স্ক্যানিং বা ইমেজিং) ও বচনে(প্রিন্টিং) সরাসরি সংযোগ তৈরী করে। ফটোকপিয়ার-এর ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে এই প্রোগ্রামিং যতনিখুঁত হয়, এবং ব্যাক্তি-মস্তিষ্কের ব্যবহার যত কম হয়, ততই নির্ভুল অনুলিখন সম্ভব। সৃজনশীলতার পরিমাপেফটোকপিয়ার-এর প্রাপ্তি যদি সর্বনিম্ন (শূন্য) হয়, বিশ্বব্রহ্মান্ডের স্রষ্টা পাবেনসর্বাধিক। এ’দুয়ের মাঝে বিশাল ফারাক, যেখানে নানারূপে ও কাতারে আমাদের অবস্থান।প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে সৃজনশীলতার সরাসরি সম্পর্ক আছে কি নেই তাপ্রশ্নসাপেক্ষ। তবে নির্দিষ্ট শিক্ষাব্যবস্থা নতুন প্রজন্মকে সৃজনশীল করছে, না তাদেরকেফটোকপিয়ারে রুপান্তরিত করছে, তা ভেবে দেখা জরুরী। সাধারণ শিক্ষায় মুখস্ত-বিদ্যারপ্রাধান্য ও বিস্তার সন্দেহাতীত ভাবে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগায়। সত্যি বলতে কি,বিকারহীন মনুষ্য-শরীরে বোমা বিস্ফোরনের দৃশ্য স্মরণ করলে, এই শিক্ষা-ধারার সম্ভাব্যঅশুভ ফলশ্রুতি শংকা জাগায়। সে বিষয়ে দৃষ্টিগোচরের উদ্দেশ্যেই, মূলতঃ বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষাকে আলোচনায় রেখে এ নিবন্ধের অবতারনা।

ছ’বছর আগে একটি ইংরেজী দৈনিকে ‘ইন সার্চ অফ এ ব্রেইন ইন দ্য বডি’ (‘শরীরের ভিতর মস্তিষ্কের সন্ধানে’) শীর্ষক একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। কথা প্রসঙ্গে সেখানে উল্লেখ করেছিলাম যে প্রযুক্তির অগ্রগতি যে ধারায় ঘটেছে তা মানব সমাজে মস্তিষ্কের (স্বাধীন মনন প্রক্রিয়া’র) আপেক্ষিক চাহিদা কমিয়ে (শ্রমের বিকল্প স্বরুপ) যন্ত্র বা যন্ত্র-রুপী মানুষের চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছে। একটা সময় ছিল যখন কৃত্রিম মেধা (আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স) তৈরীতে বিজ্ঞান সাধনায় অনেক বিনিয়োগ হতো। তবে, ব্যাক্তি যখন নিজের খরচেই নিজ-তাগিদে জৈবিকযন্ত্রে রুপান্তরিত হতে চায়, কৃত্রিম-মেধা তৈরীতে বিনিয়োগের প্রয়োজন থাকে না। বাজারের কি নিষ্ঠুর পরিহাস – স্বেচ্ছায় মানসিক দাসত্বকে আমরা মেনে নিয়েছি! এ দাসত্বের একটি প্রকাশ ঘটে যখন আমাদের কর্ম ও প্রতিক্রিয়া বহিঃনিয়ন্ত্রিত হয়, যা পূর্বলেখন (প্রোগ্রামিং) করা যন্ত্ররুপী মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বলার অপেক্ষা রাখে না, শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই ফটোকপিয়ার তৈরী করতে ব্যর্থ হলেও ‘শিক্ষিত’দের নির্দিষ্ট প্রোগ্রামিং-এর নিয়ন্ত্রণে আনতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

ইতিহাসের ছিটেফোঁটা

মানব-জ্ঞানের পরিসীমা যখন তুলনামূলক ভাবে সীমিত ছিল এবং সেই জ্ঞানের পরিধি যখন অনেকাংশেই ব্যাক্তি-মানসের ধরা-ছোঁয়ার আওতায় ছিল, শিক্ষার প্রকৃতি ছিল ভিন্ন – সঙ্গত কারনে, আশ্রম-কেন্দ্রিক শিক্ষার প্রাধান্য ছিল। অর্থাৎ, একই গুরু’র সান্নিধ্যে কিছুকাল থেকে সুনির্দিষ্ট শিক্ষা অর্জনের ব্যবস্থা থাকতো। মৌর্য সাম্রাজ্যের পূর্বেই, অথবা গ্রীক সভ্যতার শীর্ষকালে শিক্ষকতায় কিছুটা বিশেষজ্ঞায়ন (স্পেশিয়ালাইজেশন)-এর নিদর্শন পাওয়া যায়।একই শিষ্যকে একাধিক গুরু’র আশ্রমে কিছুকাল কাটানো এরই প্রকাশমাত্র। সেসব আজ অতীত – এমনকি পঞ্চম দশকে গড়ে উঠা নালান্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য বিদেশী আগ্রাসনে বিলীন হয়েছে। শুধু তাই নয়, ব্রাহ্মনবাদের পুনঃস্থাপন ও সমান্তরাল ভাবে আফগান ও মোঙ্গল-সূত্রে মুসলমান শাসনকালে এই উপমহাদেশে সংস্কৃত ও ফারসী-কেন্দ্রিক দ্বি-ধারার মৌলিক শিক্ষা মূলতঃধর্মপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রসার পায়। পেশাভিত্তিক বা কারিগরী/ব্যবসা শিক্ষা বহুলাংশেই পরিবার-কেন্দ্রিক ছিল। উপনিবেশ আমলে স্বদেশের পক্ষে ধর্ম-কেন্দ্রিক অথবা গনসচেতন-প্রয়াসী ক্লাব ঘিরে ভিন্ন শিক্ষার প্রয়াস থাকলেও, বিশ্ব-পরিসরে সর্ব-বিষয়ক প্রাথমিক শিক্ষার যে প্রসার ঘটে, এই উপমহাদেশ তার বাইরে থাকেনি। বরং, ধর্ম-কেন্দ্রিক কাঠামো ব্যবহারের সুযোগ সীমিত থাকায়, ইংরেজী শিক্ষা প্রসারের মাধ্যম হিসেবে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় নব-আবিষ্কৃত স্কুল-কলেজ ভিত্তিক সাধারন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমাদের দেশেই বিগত শতাব্দীর শেষাবধি ন্যুনতম চার-পাঁচটি জেনারেশন গড়ে উঠেছে বহু শিক্ষকের নিয়োগকারী প্রাথমিক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে বেড়ে উঠার উল্লেখজনক কয়েকটি বছর কাটিয়ে। এ ব্যবস্থার ফলে শিক্ষাকে সম্প্রসারিত করা সম্ভব হয়েছে এবং জনগোষ্ঠী’র অনেককে এ ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি সম্ভব হয়েছে।

তবে ক্ষোভ কেন?

বহুবছর গবেষণা কাজের সুবাদে বিশ্ববিদ্যালয় পাশকরা অনেক ছাত্র-ছাত্রী’র সংস্পর্শে আসার সুযোগ ঘটেছে – বাইরে পড়তে যাওয়া বা কাজের বৃহত্তর অঙ্গনে প্রবেশের প্রাক্কালে। নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি-পরিচিতি ব্যাপক; তবে অনেকক্ষেত্রেই তা আংশিক এবং ফেসবুক জাতীয় সামাজিক নেটওয়ার্ক-এ আবদ্ধ। বলতে দ্বিধা নেই, ক্রমান্বয়ে যেন ফটোকপিয়ার-এর বিস্তার দেখতে পাই। এব্যাপারে প্রথম হোঁচট খেলাম যখন, ছ’-সাত বছরআগে, এম,এ, পরীক্ষায় প্রথম হওয়া জনৈক ছাত্র পাঠ্যপুস্তক লেখার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। সে জানালো যে তার ‘নোট’ পরবর্তী তিন-চার বছরের ছাত্র-ছাত্রীরা ফটোকপি করে নিয়মিত পড়ে আসছে এবং তার ভিত্তিতে পরীক্ষায় ভালো ফলও পাচ্ছে। এটা অনস্বীকার্য যে জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত হওয়ার সাথে সাথে পাঠ্যপুস্তিকার প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। দুঃখজনক হলেও সত্যযে একই যুক্তিতে, বই পড়ার অভ্যেস কমে যাওয়ায় শিক্ষকের দেয়া নোট অথবা শ্রেণী কক্ষে শিক্ষকের উপস্থাপনার ভিত্তিতে তৈরী কোনও ছাত্রের নোট-এর চাহিদা বহুলমাত্রায়বৃ্দ্ধি পায়।

জ্ঞানের বিশাল সমুদ্রকে বিষয়-ভিত্তিক খন্ডন করে কিছু নির্যাস তুলে ধরার ক্ষেত্রে পাঠ্যপুস্তিকা’র ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিছু মৌলিকশিক্ষার ক্ষেত্রে এর আবশ্যিকতা সহজবোধ্য – কিন্তু দ্রুত-পরিবর্তনশীল সমাজে অনেক প্রায়গিক শিক্ষার ক্ষেত্রে সম্ভবত সেটা সত্য নয়। আমাদের কালে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন কোন শিক্ষক সুনির্দিষ্টবই অনুসরণ করতেন, কিন্তু বিষয়-ভিত্তিক আলোচনার জন্য আমরা ব্যাক্তি ও দল-পর্যায়ে পাঠাগারে ভিড় জমাতাম অথবা নতুন-কিছু হঠাৎ পাবার আশায় নীলক্ষেতে’র পুরোনো বইয়ের দোকানে হাতড়ে বেড়াতাম। সেসময় অবশ্য শিক্ষা চার দেয়ালের মাঝে আবদ্ধ ছিল না। নিঃসন্দেহে টেলিভিশনের ছড়াছড়ি ছিল না – তাই চলমান ঘটনা তাৎক্ষণিকভাবে জানার সুযোগ ছিল না। ইন্টারনেট-এর অনুপস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী বিশাল জ্ঞানভান্ডার আমাদের নাগালের বাইরে ছিল। সম্ভবত, সেসব কারনে পরিবার, পাড়া, কোন এক মফস্বল শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত আড্ডাখানা, এবং জাতীয় রাজনীতি’র শিক্ষাঙ্গনে পাঠ নেয়ার সুযোগছিল। অনস্বীকার্য যে ‘চর দখলে’ ব্যস্ত আমাদের প্রজন্ম সেই বৃহত্তর শিক্ষাঙ্গনকে সংকুচিত করে সে শিক্ষা থেকে নতুনদের কেবল বঞ্চিতই করেনি, আমরা তাদের তথাকথিত সামাজিক নেটওয়ার্ক ‘ফেসবুক’ ও টুইটার-এর ভার্চুয়াল সাম্রাজ্যে ঠেলে দিয়েছি। এসবের মাঝে কেবলমাত্র সনদ-প্রাপ্তির জন্য (যা অনেকক্ষেত্রে অভিবাসন-স্বপ্ন বাস্তবায়নকে সহজতর করে) স্বল্পকালের জন্য যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে, তাদের কাছে জ্ঞানার্জন বাতার অংশবিশেষ সম্পর্কে শিক্ষিত হবার আকাঙ্ক্ষা বা অনুপ্রেরণা নাও থাকতে পারে। অথবা, সামগ্রিকভাবে প্রচলিত শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা হয়তো নাই, এবং সে কারনে, তার প্রতি আগ্রহও কম।ভিন্ন প্রেক্ষিত থেকে বললে, এই সীমিত গন্ডীতে নোট বইয়ের বেড়াজাল থেকে বেরুতে পারলেও পাঠ্যপুস্তক-কেন্দ্রিক শিক্ষা নতুন প্রজন্মকে কতখানি জ্ঞান-সমৃদ্ধ করতে পারবে? যদি সে শিক্ষা ফটোকপিয়ার তৈরী করে, কৃত্রিম মেধার বাজারেই বা তার মূল্য কতটুকু? আর ফটোকপিয়ার না হয়ে যদি কেউ ভ্রান্ত শিক্ষার কারণে পূর্বলেখনের বেড়াজালে আটকে পড়ে, তারই বা পরিণতি কি?

শিক্ষার বিপণন – সীমিত দৃষ্টান্ত

শিক্ষা যে পণ্যে রুপান্তরিত হয়েছে, সে ব্যাপারে সম্ভবতঃ অধিক-সংখ্যক ব্যাক্তি একমত, যদিও তার সামগ্রিক অনুধাবনমুক্ত-আলোচনায় সেভাবে পরিষ্ফুটিত হয়নি। দু’মাস আগে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বাজারে আসা নতুন একটি টেক্সট বইয়ের সন্ধান পেলাম – সহকারী লেখকের/কন্ট্রিবিউটর-এর তালিকায় উত্তর আমেরিকা ও যুক্তরাজ্যের অনেকগুলো নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকার নাম দেখলাম। এদের দু-একজন পূর্ব-পরিচিত, তাই জানতে চাইলাম বইটি কেমন। একজন তো অবাক, বইটির নামই শুনেনি – কোনও একসময় হয়তো ই-মেইলের মাধ্যমে নাম তালিকাভুক্তির সম্মতি নেয়া হয়েছিল! বাজারজাতের উদ্দেশ্যে এজাতীয় কৌশল (স্ট্র্যাটেজী) হর-হামেশাই দেখা যায়। অপরপ্রান্তে, একটি ভালো পাঠ্যপুস্তক থাকলে জীবিকা উপার্জনে নিয়োজিত একজন শিক্ষকের শ্রমকষ্ট অনেকখানি লাঘব হয়। আমার জানা ছিলনা যে বহু দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক বিষয় নির্দিষ্ট পাঠ্যপুস্তকের সারিবদ্ধ অধ্যায় অনুযায়ী পড়ানো হয় (কেউ চাইলে ইন্টারনেট ঘেটে আমার বক্তব্য যাচাই করতে পারেন)। এব্যাপারে প্রশ্ন তুলে বিপাকে পড়লাম – দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিয়োজিত অনেকেই স্মরণ করিয়ে দিলো — বহু বছরের অভিজ্ঞতায় এই পাঠানুক্রম গড়ে উঠেছে, যার নিঃসন্দেহে ভিত্তিআছে। শিক্ষা-ব্যবস্থাপনার সাথে যুক্ত বন্ধুদের কাছ থেকে জানলাম যে প্রতিষ্ঠিত পাঠ্যপুস্তকে চিহ্নিত একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর বাইরে তরুণ শিক্ষকদের বিচরণ করতে দিলে হিতে বিপরীত হবার সম্ভাবনাই বেশী! আরো পরে জেনেছি যে ছাত্র-ছাত্রীদের অনেকেই নির্দিষ্ট পাঠ্যপুস্তক-নির্ভর এই ব্যবস্থাতে সহজবোধ করে। সঙ্গতকারনেই, পাঠ্যপুস্তক-কেন্ত্রিক ক্লাসরুম শিক্ষা স্থায়ীত্ব পেয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিস্তারের সাথে তাল মিলিয়ে অধিক গুরুত্ত্ব অর্জন করেছে।

এই নিবন্ধ লেখার সময় জনৈকা শিক্ষাবিদ ডেবরা স্কট-এর ২০১২ অক্টোবরে প্রকাশিত একটি নিবন্ধ দৃষ্টিগোচর হলো। সেখানে কর্পোরেট শক্তির হাতে মার্কিনী উচ্চশিক্ষা-ব্যবস্থার ধ্বংস হবার বর্ণনা পাওয়া যায়। ধ্বংসের পাঁচটি দিকের শেষটিতে শিক্ষার্থীদের ধ্বংসের কথা উল্লেখ করা হয়। দুটি উপায়ে এই ধ্বংস-প্রক্রিয়া কার্যকরী করা হচ্ছে বলে লেখিকা উল্লেখ করেনঃ “শিক্ষার মান এমন ভাবে ধ্বংস করা হয় যেন ক্যাম্পাসে কেউ সত্যিকার অর্থে চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে, বা যুক্তিবাদী হতে না পারে। এসবের পরিবর্তে তারা আদেশ মানতে, …, নিয়ম অনুসরণ করতে, এবং খামখেয়ালীপনা ও তিরষ্কার সহ্য করতে শিখছে।“ লেখিকা শিক্ষার বিষয়বস্তু নির্বাচনে ও শিক্ষাপদ্ধতি’র সাথে ফাষ্টফুড রেস্তোরা’র উৎপাদন-প্রক্রিয়ার সাদৃশ খুঁজে পান। পন্যে রুপান্তরের এই প্রক্রিয়ায় মার্কিনী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে ঋনদানকারী বাণিজ্যিক ব্যাংকের আঁতাতের কথাও লেখিকা উল্লেখ করেন। শিক্ষার মানের নিম্নমুখীতা এবং সেইসাথে যুক্তি-চিন্তারপ্রতি বিমুখতার প্রসার যে সার্বজনীন রুপ নিয়েছে, তা আরো অনুধাবন করলাম যুক্তরাজ্যও উত্তর আমেরিকার কিছু শিক্ষকদের সাথে আলোচনাকালে। ডেবরা’র বক্তব্যের যথার্থতা খুঁজে পেলাম যখন জানলাম যে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে আসা পিএইচডি পড়ুয়া বা উচ্চ-শিক্ষিত অভিবাসনকারীদের অতি নগণ্য মজুরীতে নিয়োগ দিয়ে এক-একটি ক্লাসে ১৫০ থেকে ২০০ জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে পড়ানোর যে ব্যবস্থা চালু হয়েছে, তা মনন-বিকাশে ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। শেষোক্ত দৃষ্টান্ত বিশদ ঘাটলে বহুমাত্রিক আলোচনার সূত্রপাত হতে পারে – স্বল্পোন্নত দেশ থেকে অর্থ ও মেধা পাচার, জ্ঞানের নামে অজ্ঞানতার পুনরুৎপাদন ও ফিরতি অভিবাসনের মাধ্যমে তার বিশ্বব্যাপী সম্প্রসারণ, ইত্যাদি। [অনেক তরুণ শিক্ষক আমার মন্তব্যে মর্মাহত হতে পারেন। বলতে দ্বিধা নেই যে আমি নিজেও কথিত পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়ায় অবদান রেখে এসেছি।] শিক্ষাব্যবস্থার অধোগতির ধারা পরিবর্তন আদতেই সম্ভব কিনা তা ভিন্ন পরিসরে ভাববার প্রয়োজন রয়েছে, এবং তার প্রাসঙ্গিকতা সার্বজনীন। সে আলোচনার প্রতি দৃষ্টিপাত করেই এ নিবন্ধ শেষ করবো।

শিক্ষাপণ্যের বাজার, অনাকাঙ্ঘিত ভারসম্য ওসম্প্রসারিত শিক্ষায় লুপ্তপ্রায় জবাবদিহিতা

আমার সৌভাগ্য হয়েছিল খুলনা’র একটি মিশনারী স্কুলে পড়বার, যেখানে ইতালী থেকে আসা জনৈক ফাদার ব্রুনো হেডমাষ্টার ছিলেন। অধিকাংশ শিক্ষক স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আমাদের উন্নতির জন্য নিজেদের ব্যাক্তি-জীবনের অনেক কিছুই হয়তো ছাড় দিয়েছিলেন। স্মরণ করলে আশ্চর্য্য লাগে যে সেসময়, ক্ষেত্র-বিশেষ ব্যতিরেকে, অভিভাবক-শিক্ষক মিটিং-এর প্রয়োজন ছিল না। ছাত্র-ছাত্রীদের দ্বারা শিক্ষক-শিক্ষয়িত্রী’র মূল্যায়ণ-এর অধুনা চল সে সময় কল্পনাতীত ছিল। সরকারী উদ্যোগের বাইরে সামাজিক দায়িত্ববোধ হতে স্বতঃপ্রণোদিত ব্যাক্তি-প্রতিষ্ঠাতা এবং শিক্ষককূল তাঁদের সর্বাত্বক ঢেলে দিয়েছেন – বাড়তি খবরদারী’র কথা মনে পড়ে না। অধিক সম্প্রসারিত শিক্ষাব্যবস্থায় আজকের অবয়বটা ভিন্ন।

পূর্বোল্লেখিত ডেবরা স্কট-এরকর্পোরেট-চক্রান্তে শিক্ষা-ধ্বংসের তত্ত্ব না মানলেও, এবং প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতি সাধনের ফলে সৃজনশীল মেধার আনুপাতিক চাহিদা’র অস্বাভাবিক হ্রাসের কল্পকাহিনী যদি কেউ অস্বীকারও করেন, আজকের শিক্ষাঙ্গনে (বিশেষত,ব্যাক্তি-মালিকানাধীন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার ক্ষেত্রে) ন্যূনতম নিম্নোক্ত চারটি গোষ্ঠীর উপস্থিতি সকলেই মেনে নিবেনঃ

  • শিক্ষা যোগানের জন্য প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও তাদের প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক/কতৃপক্ষ;
  • অধ্যাপনার সাথে জড়িত ব্যাক্তিরা যারা মূলত কর্মজীবি (ভিন্ন আলোচ্য বিষয়ের কারনে প্রশাসনের ভূমিকা এখানে উল্লেখ করছি না);
  • অধ্যায়নরত ছাত্র-ছাত্রী; এবং
  • শিক্ষার ব্যয়-বহনকারী ব্যাক্তি – যদিও কোনও কোনও ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী নিজেই খরচ বহন করেন, আমাদের দেশে এখনও পর্যন্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিভাবক বা মা-বাবা এ’খরচ বহন করেন।

এর বাইরে আরো দুটো গোষ্ঠী’র গুরুত্ত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে –পাঠ্যপুস্তকের প্রকাশনা ও বিতরণ-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী যা অনেকক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে; এবং ডেবরা-উল্লেখিত শিক্ষা ও শিক্ষা-ব্যবস্থার উপর আন্তর্জাতিক কর্পোরেট খাতের প্রভাব, যা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রযোজ্য নয়। বাকী আলোচনায় এদেরকে অনুহ্য রাখবো। মূলত বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনার ক্ষেত্রবিস্তৃত করতে শিক্ষাকে সৃজনশীল করবার দিকগুলো আলোচনায় আনবো।

গত প্রায় দেড়-দু’যুগ ধরে শিক্ষার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। অনেকে হয়তো মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি)’কে কৃ্তিত্ব দিবেন। অন্যেরা হয়তো বলবেন যে শ্রম-নিয়োগ নিশ্চিত করতে যে পুঁজির বিকাশ এদেশে ঘটা প্রয়োজন ছিল, তা না হওয়ায় এক বিশাল জনগোষ্ঠী ব্যাক্তি ও পরিবার-জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত-কল্পে শিক্ষাকেই মূখ্য অবলম্বন হিসেবে দেখেন। সেই চাওয়াটা অনেক ক্ষেত্রে কার্যকরী সম্ভব হয়েছে বিদেশে শ্রম-রপ্তানী করে আয় প্রাপ্তির ফলে। পিছনের দিকে তাকালে মনে হয়, গোল্ডেন জিপিএ, দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশী লেবাশের শিক্ষা-সনদ প্রাপ্তির সহজ লভ্যতা; এবং সেই সাথে বাণিজ্যিকভাবে শিক্ষা-সম্প্রসারণের ব্যবস্থা একত্রে আগুনে ঘি দেয়ার মত কাজ করেছে। ব্যাখ্যা না করেই বলবো, গৃহ বা এপার্টমেন্ট-খাতে যেমন(যুক্তরাষ্ট্রে) মূল্যবৃ্দ্ধির হিড়িক পড়েছিল (যাকে অনেকে হাউজিং বাব্বল/বুদবুদ আখ্যায়িত করেন), অথবা শেয়ারবাজারে সর্বস্তরের জনগন তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় যেমন অতি মুনাফার লোভে ঢেলে দিয়েছিলেন; পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে সাধারন শিক্ষাকে নিয়ে তেমনি এক হিড়িক পড়েছে। এই হিড়িকে অভিভাবক ভালো ফল দেখলেই খুশী, কম পরিশ্রমে পরীক্ষায় ভালো করতে পারলে শিক্ষার্থীরাও খুশী,শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে মুনাফা নিশ্চিত হলে কতৃপক্ষও খুশী। এবং, এসবের মাঝে ছাত্র-ছাত্রীর মূল্যায়ণে টিকে থেকে কর্ম-সংস্থান নিশ্চিত করতে ও কোর্সের চাপ সইতে একজন শিক্ষক-এর যা যা করণীয় সম্ভবত সেসবই তিনি করেন। একটি সনাতনী টেক্সট বই, এবং তা যদি নামকরা কিছু পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের লেখা হয়, শিক্ষকতায় পড়ানোর শ্রম অনেকাংশেই লাঘব করে। ছাত্র-ছাত্রীরা যদি সেটার প্রয়োজনীয় অংশ মুখস্ত করে পরীক্ষায় ভালো ফল পেতে পারে, তবে তো সোনায়সোহাগা। সকল সামাজিক ও অর্থনীতিক শক্তিগুলো বর্তমান ভারসম্যে ভূমিকা রেখেছে, যে ভারসম্যে অগণিত ফটোকপিয়ার তৈরী হচ্ছে! পূর্বলেখনের কথা উল্লেখ করেছিলাম, যার সাথে নোম চমস্কি’র প্রতিবোধন (ইনডক্ট্রিনেশ্যন)তত্ত্বের সাদৃশ রয়েছে। আমার স্বল্প অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে যে আমাদের নতুন প্রজন্মের পূর্বলেখন বা প্রতিবোধন ভিন্ন সূত্র থেকে হচ্ছে – এবং বর্তমান শিক্ষা’র লক্ষহীনতাই সে প্রক্রিয়াকে তরান্বিত করেছে। সম্ভবত শিক্ষাঙ্গন থেকেই তার প্রতিরোধের সূত্রপাত হবে! সে বিশাল আলোচনা এ’নিবন্ধে করা সম্ভব নয়।

আবারো শিক্ষাপণ্যের বাজারে ফেরা যাক! শিক্ষার সনদ-প্রাপ্তিকে মানবসম্পদ উন্নয়নের সমার্থক গণ্য করলে এবং অতীতের আলোকে শিক্ষা-বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্তির হার বেশী মনে করলে, উচ্চ-শিক্ষার চাহিদা তেজী থাকাটাই স্বাভাবিক। সন্দেহাতীত যে, নিয়ত-সম্প্রসারণশীল অর্থনীতিতে আজবধি উচ্চ-শিক্ষিতদের সহজে কর্ম-সংস্থান হওয়ায় বর্তমানের এ ভারসম্য পরিবর্তনের তাগিদ অনুভূত হয়নি। যদি এ ভারসম্য মানব-সম্পদ উন্নয়নে ভূমিকা রাখে এবং আগামী দিনেও অর্থকরী কর্ম-সংস্থান নিশ্চিতকরে, কারো কোনও ক্ষোভ প্রকাশের কারন থাকবে না। কিন্তু ভেবে দেখুন, সেটা যদি না হয়, উচ্চ-শিক্ষারসনদ-প্রাপ্ত বেকার তরুণদের বিক্ষোভ, শেয়ার বাজারে ব্যর্থ-জুয়ারীদের অসন্তোষের চাইতেও বহুগুণ অগ্নিমাখা হতে পারে! এ জাতীয় ক্ষেত্রে, পরিণতির পূর্নচিত্র দেখে পরিবর্তন আনতে চাইলে বিপরীত স্রোতধারা তৈরী অসম্ভব হতে পারে।

নিজস্ব গতিতে বাজারে কাঙ্ক্ষিত ভারসম্য ফিরে আসায় যারা বিশ্বাসী, তারা আমার আশংকাকে অমূলক মনে করবেন। তথাপি, নানা কথায় ব্যক্ত করেছি যে উপরোল্লেখিত ভারসম্য অনাকাংখিত এবং তার স্থায়ীত্ব নিশ্চিত নয়। অর্থনীতিক বিশ্লেষণে এই শিক্ষা-বাজারে দুটো পথে নতুন স্থিতি আনা সম্ভব। যদি সনদ-প্রাপ্তির প্রকৃ্ত বাজার দাম শিক্ষাপ্রাপ্তদের কর্ম-সংস্থানে ও অর্থপ্রাপ্তিতে সংকট (বা ঘাটতি) আনে এবং তা অভিভাবকদের চোখে দ্রুতধরা পড়ে, শিক্ষাপ্রাপ্তির বর্তমান হিড়িক প্রশমিত হবে এবং তা (চাহিদা হ্রাসের মাধ্যমে) শিক্ষাখাতে দক্ষতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে। দ্বিতীয়, যদি শিক্ষার উপাদান ও ধরণ মেধাবৃ্দ্ধির সহায়ক ও বাজারোপযোগী (কর্ম-সংস্থানে সহায়ক) হয়, সেক্ষেত্রে নতুন মাত্রায় শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হবে যা শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে মেনে নিয়েই প্রয়োজনীয় মেধা তৈরীতে মনোযোগী হবে। শেষোক্ত পথটিদেখার ক্ষেত্রে অবশ্য ভিন্নতা আছে – কেউ কেউ মনে করেন যে, ন্যুনতম কারিগরী দক্ষতা নিশ্চিত করে যদি মননশীল মানুষ তৈরী হয়, তা উপযুক্ত সমাজ ও অর্থনীতি গড়ে ব্যাক্তির সুব্যবস্থা করতে অনেক বেশী কার্যকর ও টেকসই ভূমিকা রাখবে। শেষোক্ত পথটি সকলের কাম্য হলেও, আগেই উল্লেখ করেছি যে, তা অর্জনের তাগিদ নানা কারনে অনুভূত নাও হতে পারে – পরনির্ভর বিকৃ্ত শ্রম-বাজার তার একটি অন্যতম কারন। সমাজের অগ্রজদের সে ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়ে ভাবা প্রয়োজন। আমি মনে করে, অদূর ভবিষ্যতে এই হিড়িকের মাঝেই চলমান থেকে আমাদের নতুন পথ খুঁজতে হবে, যা শিক্ষার বিষয়-বস্তুকে অধিক স্বদেশমুখী করবে এবং ব্যাক্তি-মানুষকে সৃজনশীল করবে। হয়তো দেশকে জানার প্রয়োজনীয়তা এখনও শেষ হয়নি এবং বিদেশে পাড়ি জমাতে হলেও আমাদের নতুন প্রজন্ম ফটোকপিয়ার-এর ভূমিকায় অবতীর্ন না হয়ে যেন মেধার জোরে দেশ ও জাতির মুখোজ্জ্বল করতে পারে। সেই আলোচনা ও পর্যালোচনা গঠনমূলকভাবে শুরু হোক, এটাই এ নিবন্ধের লেখকের মূখ্য কামনা।

লেখক ইকোনমিক রিসার্চগ্রুপ-এর সাথে অর্থনীতিক গবেষণায় যুক্ত এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি’র খন্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে ভিন্নভাবে পড়ানোর সুযোগ পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে কৃ্তজ্ঞ। রচনাকালঃ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর, ২০১৩