আবাসন খাতের শ্রমবাজার-এর বিবর্তন
March 1, 2018
উপমহাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপ্তি ও বিবর্তন
March 3, 2018

রামপালে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র, সুন্দরবন ও ভূখণ্ডের স্বার্থ— এক নাগরিকের অর্থানুসন্ধান

চ্ছাকরেই ‘অর্থানুসন্ধান’ শব্দটি জুড়েছি। তথাকথিত ‘সুশীল’ দের অর্থের (টাকা-পয়সা) অনুসন্ধানের সঙ্গে ব্যক্তি-নাগরিকের তথ্য-প্রচারণার মারপ্যাঁচ থেকে বেরিয়ে চলমান নীতি ও ঘটনার অন্তর্নিহিত অর্থ (মানে) খোঁজার প্রয়াসে নিঃসন্দেহে সংঘর্ষ রয়েছে! সুন্দরবনের অদূরে অবস্থিত রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে জনস্বার্থের প্রতিনিধি সরকার বা নীতিনির্ধারকদের যে বিষয়গুলোর প্রতি নজর দেয়া প্রয়োজন, সে সব উল্লেখ করেছি। এবং প্রসঙ্গক্রমে সম্ভাব্য ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা গুনতিতে এনে তার অশুভ দিক থেকে জনস্বার্থ রক্ষার জন্য বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সরকারের চুক্তিতে অধিক স্বচ্ছতা আনার আবশ্যিকতা তুলে ধরেছি।

আকস্মিকভাবে দুদিন আগে ফোন পেলাম নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের এক অপরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে। জানতে চাইলেন, আমি ‘কবে ফিরব?’ জানতে চাইলাম, ‘কোথায়?’ ‘কেন, খুলনাতে।’ আমার আদি নিবাস খুলনা—বাবা ওমা, দুদিক থেকেই। কিন্তু সেই ছাত্রজীবন থেকে ঢাকায় বাস। ‘ফিরব কেন? আমি তো ঢাকায় থাকি’, জানতে চাইলে অপর প্রান্ত থেকে জানানো হলো যে, রামপাল, বাগেরহাট হয়ে ২৩ আগস্ট খুলনায় একটি ‘অবহিতকরণ’ সভা বসবে এবং সেখানে আমার উপস্থিতির সম্ভাবনা জানার উদ্দেশ্যেই ফোন। ঘটনার আকস্মিকতায় ভড়কে গিয়ে কালক্ষেপণে অপরপ্রান্ত থেকে বিদায়ী উক্তি করে ফোনালাপের সমাপ্তি টানা হয়। বাড়তি জিদ জাগায় তথ্য খুঁজতে বসি নেটে। শেষাবধি বিদ্যুত্ প্রকল্পটির পরিবেশ-পর্যালোচনা সহ সিইজিআইএসের ২০১৩ সালের জানুয়ারির নিবন্ধটি পাই। [যে কেউ নিম্নোল্লিখিত সাইটে গেলে এটি (হয়তো) পাবেন, www.indiaenvironmentportal.org.in]

বিষয়টি নিয়ে অনেক আলোচনা ও নিবন্ধ লেখা হয়েছে। আমি সেসবের আলোচনায় না গিয়ে সিইজিআইএসের রিপোর্টটি ও চলমান অবহিতকরণ প্রক্রিয়ার সূত্র ধরে কয়েকটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিদেব। বলতে দ্বিধা নেই, বিষয়টিকে ভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ভিন্নতর প্রশ্ন তুলব।

ভণিতা না করে সরাসরি কয়েকটি প্রশ্ন, বাংলাদেশের বিদ্যুত্ উন্নয়নবোর্ড (বিপিডিবি) ও ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানিকে (এনটিপিসি) এবং তাদের হয়ে যে বাংলাদেশের সংস্থা— সিইজিআইএস গবেষণা কর্মটি সম্পাদন করেছে, তাদেরকে।

প্রথমত. দেশের জন্য এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি রিপোর্ট খুঁজে পেতে এমন বেগ পেতে হবে কেন?

দ্বিতীয়ত. আজকের পটভূমিতে, প্রস্তাবিত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিপ্রেক্ষিতে, উভয় বিপিডিবি ওএনটিপিসি নাগরিক দৃষ্টিতে দুটো বাণিজ্যিক সংস্থা। স্বাভাবিক ভাবেই তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ ও নাগরিক স্বার্থের সম্ভাব্য সংঘাত বিশ্লেষণ ও সমাধানের পথ ভিন্ন কারো হাতে ন্যস্ত হওয়া আবশ্যিক ছিল। বিপিডিবি বাংলাদেশ সরকারের অঙ্গসংগঠন হতে পারে, কিন্তু যে ‘সরকার’- এর কাছে গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে আমরা জনস্বার্থ রক্ষার আশাকরি, বিপিডিবির কাছ থেকে সেটা আশা করা অমূলক।

তৃতীয়ত. কথা ছিল প্রকল্পটির পরিবেশের ওপর প্রভাব পর্যালোচনার (Environmental Impact Assessment of 2x (500-600) MW Coal Based Power Plant to be Constructed at the Location of Khulna)। অথচ সালফারডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন অক্সাইড (NO ও NO2) জাতীয় পরিবেশ-দূষণকারী পদার্থের পরিমাপের জন্য যে গাণিতিক মডেল ব্যবহার করা হয়েছে, তার বিশদ ব্যাখ্যায় না গিয়ে বাণিজ্যিক লাভের নিরিখে কোন এলাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন সমীচীন, সেটা অধিক গুরুত্ব পেয়েছে। বাতাসে নির্গত কোনো রাসায়নিক পদার্থ কী ঘনত্ব নিয়ে, কত দূরে কোনো এক লক্ষবস্তুকে কী মাত্রায় ক্ষতি করতে পারে, সে সব নির্ভর করবে—১. নির্গত পদার্থের পরিমাণ ২. বাতাসের গতি এবং ৩. বাতাস প্রবাহের দিকের ওপর। নিঃসন্দেহে পরামর্শকদের কারিগরি বিদ্যা আমার চেয়ে বহুগুণ বেশি। তবে অর্থনীতিক গবেষণায় এ-জাতীয় গাণিতিক মডেলে ‘ব্ল্যাকবক্স’ কথাটির চল আছে এবং নির্দিষ্ট গণ্ডির ভেতরে থেকে সিমুলেশন করা ব্যতিরেকে আমাদের পরনির্ভরশীলতা বেশ দুঃখজনক। সে কারণেই প্রশ্ন করব, বছরের ছয় মাস যেখানে দক্ষিণে বাতাস বয় এবং তা সরাসরি শীতকালের সুন্দরবনের শুষ্ক দেহে আঘাত হানবে, সেক্ষেত্রে বিকিরণের (diffusion) মাত্রা নিরূপণে বাতাস প্রবাহের দিক গুনতিতে না নেয়ার কারণ কী থাকতে পারে? (২৭৪ নম্বরপৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)

রিপোর্টটির শুরুতে সংক্ষিপ্তাকারে লবণচোরার তুলনায় সাপমারী-কাটাখালী (রামপাল) অবস্থান নির্বাচনের কারণ দেখাতে গিয়ে যেসব মাপকাঠির উল্লেখ করা হয়েছে, তার অনেক গুলোই নিঃসন্দেহে পরিবেশ-প্রভাব পর্যালোচনার কার্য পরিধির বাইরে। সামাজিক বাধা-বিপত্তি কম, খাস জমির অধিক প্রাপ্যতা, কয়লা পরিবহনে সুবিধা, নির্মাণ সুবিধা, যাতায়াত ব্যবস্থা ইত্যাদি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে করা বিনিয়োগের আর্থিক লাভ-ক্ষতি নিরূপণে সহায়তা করে। কিন্তু সেসব বিবেচনায় আর্থিক লাভের পরিমাণ যদি একটি প্রকল্পের পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ও অন্যান্য কুপ্রভাবকে ছাড়িয়ে যায়, তখনই তার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। আমি আশা করেছিলাম যে, রিপোর্টটি সম্ভাব্য একাধিক ব্যবস্থাপনার আলোকে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের পরিমাপ দেবে এবং ভিন্ন কোনো মঞ্চে বা রিপোর্টে ভালো-মন্দের যাচাই করা হবে। আমরা সবাই যখন এ ভূখণ্ডের উন্নতি ও একে বাসযোগ্য দেখতে চাই—একটি রিপোর্টের মাধ্যমে সাফাই গাওয়ার প্রচেষ্টা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

চতুর্থত. রিপোর্টটির শেষে (FAQ) ‘প্রায়শই উত্থাপিত প্রশ্নের’ উত্তর সংযোজন করায় সন্দেহটি আরো বাড়ে। আরো অবাক হতে হয় যখন FAQ- এর ১৬ নম্বর প্রশ্নের অসমাপ্ত উত্তর দেখি। আমি ইংরেজিতেই প্রশ্ন ও উত্তর লিপিবদ্ধ করছি— প্রশ্ন:‘Will the electricity to be produced from the power plant (proposed)’, উত্তর: ‘No, but in future if Bangladesh is surplus in electricity, then electricity can be exported to.’ লক্ষণীয় যে, দুটো বাক্য ই অসম্পূর্ণ রয়েছে— যে কেউ বলতে পারেন, ‘পরের পৃষ্ঠাটি ভুল করে সংযুক্ত করা হয়নি! ’অবাক হওয়ার নয়, উপরোক্ত ইংরেজি শব্দ গুলো ছিল রিপোর্ট টির শেষ পৃষ্ঠার শেষ দুটো লাইন। বিষয়টি আরো উদ্বেগ ঘটায় যখন মনে পড়ে যে, ২০০৯ সালের দিকে ভেড়ামারা দিয়ে গ্রিডলাইন তৈরি করে বিদ্যুত্-বাণিজ্যের চুক্তিটি নেটে পাওয়া যেত। সেখানে সুনির্দিষ্ট (স্বল্প) দামে বিপরীতমুখী বিদ্যুত্ প্রবাহের উল্লেখ ছিল। আজ তা খুঁজে পাই না—এবং অস্বচ্ছতার কারণে সত্য-মিথ্যা যাচাই প্রায় অসম্ভব।

এ পর্যন্ত যা বললাম তা অস্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের অভাবের ইঙ্গিত দেয় এবং আমাদের দুর্বলতাকে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে ব্যবহার অস্বাভাবিক নয়। এ-জাতীয় চর্চা সর্বত্র বিরাজমান। তবে সুন্দরবনের মতো যে সব সম্পদ একবার বিলীন হলে তা পুনরুদ্ধার প্রায় অসম্ভব, কোনো প্রকল্পের কার্যকলাপ সে-জাতীয় সম্পদের ওপর বিন্দুমাত্র আঁচড় দিলে তার যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় আরো স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব কাম্য। এবং এককভাবে সিইজিআইএসকে দোষারোপ করা সমীচীন নয়। আগেই বলেছি যে, বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের কারণে বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (বিপিডিবি) কাছে নির্দ্বিধায় নাগরিক স্বার্থরক্ষা আমি আশা করি না। এ-জাতীয় প্রকল্প নির্বাচনে অথবা প্রকল্পের স্থান নির্বাচনে স্থানীয় ‘গণশুনানি’ ব্যঙ্গাত্মক মনে হয়। বরং প্রয়োজন সর্বোচ্চ নেতৃত্বের উদ্যোগে পেশাদারিত্ব ও নঃআর্থিক দিকের প্রতি সংবেদনশীল মননের সম্মিলিত প্রয়াস।<br />

এ আলোচনায় অনেক পরে যোগ দিয়েছি। তাই পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা মেনে নিয়ে কয়েকটি আবেদন রেখে শেষ করব।

অনস্বীকার্য যে, অর্থনীতিক অগ্রগতি ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য বিদ্যুত্ ও অন্যান্য জ্বালানি আবশ্যক। এবং সে কারণেই পক্ষে-বিপক্ষের সবাই প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করেন না। তবে তার সম্ভাব্য নেতিবাচক দিক, বিশেষত সুন্দরবনের ওপর বিনাশকারী প্রভাব নিয়ে শঙ্কিত। সে শঙ্কা দূর করার জন্য এ-যাবত্ আমরা কারিগরি সমাধানের কথা শুনেছি। অতি সাধারণভাবে বুঝেছি যে, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গত ধোঁয়া প্রকল্প স্থানেই পরিশোধিত হবে, ফলে ছাই সহ বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ বহুলাংশে অভ্যন্তরে রয়ে যাবে। কিন্তু সেসব প্রযুক্তি আদতেই বাস্তবায়ন হবে কিনা, অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে সে শঙ্কা অমূলক নয়। এবং চুক্তির শর্তাবলিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে কিনা, তা আমরা জানি না। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে আমরা আশা করব যে, অধিক স্বচ্ছতার সঙ্গে চুক্তির শর্তাবলির বিবিধ দিক আলোচনায় এনে জনগণের শঙ্কা লাঘব করা হবে। অর্থনীতিবিদরা হয়তো আরো বলবেন, বাংলাদেশ সরকারের প্রয়োজন বার্ষিক ভিত্তিক রয়্যালটি অর্থ আদায় ও উৎপাদন ভিত্তিক কর আদায়ের ব্যবস্থা রাখা। এসব বিষয় খোলামেলা আলোচনায় এলে নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক স্বার্থ, চুক্তির মারপ্যাঁচে দেশের সরকার ও মানুষকে নাজেহাল করতে পারবেনা। যেমনটি হয়েছিল গ্যাস-খনির বিপর্যয়ে।

পরিশেষে উল্লেখ্য, এ বাণিজ্যে সাধারণ জনগণের লাভকী? সুন্দরবনের লাভ আমাদের সবারই জানা। সে সম্পদের অস্তিত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এ-জাতীয় প্রকল্পে আগ্রহ এবং ঐকমত্য জাগবে যদি আমরা জানি যে, ওই কেন্দ্র থেকে তৈরি বিদ্যুত্ এ ভূখণ্ডের অর্থনীতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার হবে। অতীতেও আমরা প্রাকৃতিক গ্যাস উদ্বৃত্তের প্রচারণার ফাঁদে পড়ে নিজ খরচায় পাইপলাইন করতে উদ্যোগী হয়েছিলাম। অনেক পরে জেনেছি যে,আমাদের নাকি সে-জাতীয় উদ্বৃত্ত নেই! একই ভাবে শুরুতেই চুক্তিতে স্পষ্ট করা না থাকলে সহনীয় দামে উৎপাদিত বিদ্যুত্ ব্যবহারে এ ভূখণ্ডের স্বত্ব নিশ্চিত করা দুরূহ হতে পারে। সহজ ভাষায় বলব, নির্দিষ্ট প্রকল্পটি নেয়া উচিত কিংবা অনুচিত—এর চেয়ে ও অধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— কী শর্তে উচিত? এবং কোন শর্ত গ্রহণযোগ্য নয়?

লেখক: নির্বাহী পরিচালক
ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ

 

Published on: August 23, 2016

 

Download Document